বাসায় মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন অভিনেত্রী, হাসপাতালে মৃত ঘোষণা
মেলবোর্ন, ২৩ এপ্রিল- ভারতের আঞ্চলিক বিনোদন অঙ্গনের উদীয়মান অভিনেত্রী দিব্যাঙ্কা সিরোহী আর নেই। মঙ্গলবার রাতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়েছে।…
মেলবোর্ন, ২৬ জুলাই-গত বছরের ৫ আগষ্ট বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার থানা বানিয়াচংয়ে ঘটে যায় এক ভয়াবহ, নজিরবিহীন ঘটনা। সংঘর্ষে উত্তপ্ত জনতা বানিয়াচং থানায় হামলা চালিয়ে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্যকে অবরুদ্ধ করে। আগুন দেওয়া হয় থানায়, লুট হয় অস্ত্র। পুলিশ সদস্যরা জীবনের নিরাপত্তা হারিয়ে প্রাণভয়ে ছুটছিলেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা—উদ্ধারের সময় বেছে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে। পরদিন তাঁর মরদেহ থানার সামনের গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু পুলিশের ওপর সহিংসতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর এক সরাসরি আঘাত। যেখানে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন উপস্থিত ছিল, সেখানেই একজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা জনতার হাতে নিহত হন। অথচ এখন পর্যন্ত ঘটনার বিচার তো দূরের কথা, মামলারও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
পুলিশ সদস্যদের দুঃসহ অভিজ্ঞতা
ঘটনার দিন রাতভর বানিয়াচং থানা ছিল অবরুদ্ধ। থানায় বন্দি ছিলেন প্রায় ৬৫ জন পুলিশ সদস্য। ভেতরে আগুন, অস্ত্রাগার পুড়ছিল, ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল তাদের। একজন পুলিশ কর্মকর্তা মো. আবু হানিফ বলেন, “আর ১০-১৫ মিনিট থাকলে আমরা দম বন্ধ হয়ে মরে যেতাম।” তিনি জানান, সেনাবাহিনী এসেও জনতার চাপের মুখে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত, সন্তোষকে জনতার দাবিতে তুলে দিলে তবেই পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার সম্ভব হয়।
ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “প্রথমে তারা সব পুলিশকে চাইতেছিল মারার জন্য, কিন্তু সেনাবাহিনী দেয় নাই। এক পর্যায়ে তারা বলছিল যে, সন্তোষকে না দিলে আমরা রাস্তা ছাড়বো না। আপনারা একজনকেও নিয়ে যেতে পারবেন না।”
ওইদিন থানায় অবরুদ্ধ অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে নিরাপদে হবিগঞ্জে সরিয়ে নেয় সেনাবাহিনী। বানিয়াচং থানা থেকে সেদিন সেনা সহায়তায় উদ্ধার হওয়া একজন পুলিশ কর্মকর্তা মোঃ আবু হানিফ বিবিসি বাংলাকে বলেন, তারা যে বেঁচে ফিরবেন সেটা ভাবতে পারেননি।

বানিয়াচং থানা; ছবি সংগৃহীত
তিনি আরও বলেন, “সেনাবাহিনী এদের সঙ্গে আলোচনা করছে যে, একটা লোককে কেমনে আমরা দেই। পরে আর উপায় না পাইয়া আটকাতে পারে নাই। আমরা ভাবছিলাম তারে থানার ভিতরে রাইখা আমাদের উঠায়া তারপরে সেনাবাহিনী একটা কিছু করবে। সেনাবাহিনী হয়তো তাকে এসকোর্ট করে নিবে কিন্তু দেখা গেছে যে, সে (সন্তোষ) যখন থানার ভিতর থেকে বের হয়ে লাইনে দাঁড়াইছে, তখনই পাবলিক তাকে থাবা মেরে নিয়ে গেছে।”
এ ঘটনার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়,আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসআর) ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেন টার্গেট ছিলেন এসআই সন্তোষ?
সন্তোষ চৌধুরীকে কেন বেছে নিয়ে হত্যা করা হলো, তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন মত রয়েছে। একাংশ বলছে, পাঁচই আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহতদের ঘটনায় তিনিই নেতৃত্বে ছিলেন বলে জনতা ক্ষুব্ধ ছিল। আবার কেউ বলছে, তার অতীতের কিছু কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে স্থানীয় রাজনীতি ও দমনমূলক অভিযানে জড়িত থাকার অভিযোগ তাকে বিতর্কিত করেছিল।
তবে অনেকেই বলছেন, তিনি ছিলেন মাদকবিরোধী অভিযানের দৃঢ় কণ্ঠস্বর। স্থানীয় একজন বলেন, “সে থানা থেকে মাদকবিরোধী অভিযান চালাইতো, মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করতো, কোর্টে চালান দিতো। ওদের বিরুদ্ধেই কাজ করতো বলেই হয়তো এই পরিণতি।”
পরিবার আজও শোকে কাতর
সন্তোষ চৌধুরী ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে। দশ মাস আগে বিয়ে, তিন মাস আগে কন্যাসন্তানের জন্ম। তাঁর মা এখনও বিশ্বাস করতে পারেন না, সব পুলিশ সদস্য বাঁচলেও তাঁর ছেলেটি কেন বাঁচলো না। তিনি বলেন, “সব বাঁচলো, আমার ছেলে কেনো বাঁচলো না?”
বাবাও একই প্রশ্ন তোলেন, “সেনাবাহিনী গেলে সে একা কেন রয়ে গেল? উত্তর পাই না।”

পাঁচই অগাস্টে বানিয়াচংয়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান; ছবিঃ সংগৃহীত
মামলা, বিচার এবং দায়মুক্তি?
বানিয়াচং থানায় পুলিশ হত্যা ও হামলার ঘটনায় গত বছর ২২ আগস্ট একটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্তে অগ্রগতি নেই, কোনো গ্রেপ্তারও হয়নি। এমনকি ২০২৪ সালের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় এ ঘটনায় দায়মুক্তির আভাস রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজুর রহমান কার্জন বিস্মিত হয়ে বলেন, “ও মাই গড! এটা হতে পারে না। হয়তো পুলিশ বাড়াবাড়ি করেছে, তাহলে বিচার করেন। আপনি যদি তাকে মেরে ফেলেন, আপনি তো একটা বিশৃঙ্খলাকে উৎসাহিত করলেন।”
তিনি আরও বলেন, “যদি কোনো ফৌজদারি অপরাধ হয়ে থাকে, সেখানে দায়মুক্তি দেওয়া যায় না। এই ধরনের দায়মুক্তি টিকবে না।”
পুলিশের পক্ষে সহানুভূতি কোথায়?
চব্বিশের গণ-আন্দোলনে পুলিশের নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসেবে ৪৪। বানিয়াচংয়ে এসআই সন্তোষ ছিলেন সিলেট বিভাগের একমাত্র নিহত পুলিশ। এনায়েতপুরে ১৫ পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, যাদের মরদেহগুলো পর্যন্ত চেনা যাচ্ছিল না।
এনায়েতপুরে নিহত এক পুলিশ কর্মকর্তার কন্যা বলেন, “যেমন ধান, পাট পালা দেয়, তেমনি লাশগুলো থানার পেছনে গাদি করা ছিল। কারো ঘিলু বের হয়ে গেছে, কেউ নামাজ পড়ে মসজিদের সিঁড়িতে পড়ে ছিল।” তিনি বলেন, “আমরা বিচার চাই।”
মানবাধিকার আইনজীবী এলিনা খান বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত হওয়া উচিত। যেই জড়িত থাকুক না কেন, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না।”
তিনি আরও বলেন, “একটা হত্যা হলেও তার ডায়েরি থাকা উচিত। তদন্ত, চার্জশিট বা রিপোর্ট যা-ই হোক, তা লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার। কারণ ইতিহাস অনেক দূর পর্যন্ত যায়।”
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au