এরিন প্যাটারসন প্রি-সেন্টেন্সিং শুনানির আগে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছান।
ছবি: জেসন এডওয়ার্ডস
মেলবোর্ন, ২৫ আগষ্ট- অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ার সুপ্রিম কোর্টে সোমবার এক আবেগঘন শুনানিতে প্রসিকিউশন দাবি করেছে, তিনটি হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত এরিন প্যাটারসনকে প্যারোলের সুযোগ ছাড়াই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হোক। ক্রাউন প্রসিকিউটর জেন ওয়ারেন আদালতে বলেন, ডন ও গেল প্যাটারসন এবং হিদার উইলকিনসনের মৃত্যু ছিল “ধীর ও যন্ত্রণাদায়ক” এবং অভিযুক্ত এরিন পরিকল্পিতভাবে ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করেছেন।
ওয়ারেন বলেন,
“এটি সর্বোচ্চ মাত্রার অপরাধ। এমন অপরাধ যা এতটাই নিষ্ঠুর ও ভীতিকর যে আদালতের কোনও দয়ার যোগ্য নন তিনি।”
আদালতে আবেগঘন মুহূর্ত
এরিন প্যাটারসন আদালতে মুখোমুখি হন তার ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের এবং একমাত্র জীবিত থাকা অতিথি ইয়ান উইলকিনসনের। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ভিক্টোরিয়ার লিওনগাথায় নিজের বাড়িতে ‘বিফ ওয়েলিংটন’-এর মধ্যে ডেথ ক্যাপ মাশরুম মিশিয়ে পরিবেশন করেছিলেন এরিন, যাতে চারজন গুরুতর অসুস্থ হন এবং তিনজনের মৃত্যু ঘটে।

ডন ও গেল প্যাটারসন এবং হিদার উইলকিনসন (মাঝে) মৃত্যুবরণ করেন ডেথ ক্যাপ মাশরুম মেশানো বিফ ওয়েলিংটন খাওয়ার পর।
(এবিসি নিউজ)
ইয়ান উইলকিনসন, যিনি সেই মারণ লাঞ্চ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন, আদালতে উপস্থিত হয়ে এরিনকে উদ্দেশ করে বলেন,
“আমি আর এরিন প্যাটারসনের ভিকটিম নই। বরং সে আজ আমার দয়ার ভিকটিম। আমি তাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি।”
তিনি স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “আমার সুন্দরী স্ত্রী হিদার ছিলেন সহানুভূতিশীল, সাহসী এবং সমাজের জন্য নিবেদিত একজন মানুষ। আজ আমাদের পরিবার থেকে একটি অমূল্য সদস্য চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল।”
পারিবারিক ক্ষোভ ও বেদনা
ইয়ান ও হিদারের মেয়ে রুথ দুবোয়া তার বক্তব্যে বলেন, মা হারানোর পর থেকে তার জীবনে এক অদৃশ্য দুঃখের ভার নেমে এসেছে। তিনি আরও বলেন, এরিনের পরিকল্পনা ও মিথ্যাচার ছিল অকল্পনীয় ও অমানবিক।

সোমবারের প্লি শুনানিতে সাইমন প্যাটারসন শারীরিকভাবে উপস্থিত ছিলেন না, তবে তার ভিকটিম ইমপ্যাক্ট স্টেটমেন্ট আদালতে পড়ে শোনানো হয়।
(এএপি: দিয়েগো ফেডেলে)
এদিকে এরিনের স্বামী সাইমন প্যাটারসন সরাসরি আদালতে হাজির না থাকলেও তার পক্ষ থেকে পড়া বিবৃতিতে তিনি জানান, এই হত্যাকাণ্ড তাদের দুই সন্তানকে এক ভাঙা পরিবারের বোঝা বইতে বাধ্য করেছে। “প্রায় সবাই জানে যে তাদের মা-ই তাদের দাদা-দাদিকে হত্যা করেছে।”
তবে তিনি গণমাধ্যমের কিছু অংশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, যারা তার পরিবারকে হয়রানি করেছে ও অনৈতিক আচরণ করেছে।
কারাগারে এরিনের জীবন
শুনানিতে আদালতকে জানানো হয়, দণ্ডপ্রাপ্ত এরিন বর্তমানে মেলবোর্নের ডেম ফিলিস ফ্রস্ট সেন্টারের কুখ্যাত গর্ডন ইউনিটে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বন্দি রয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে তাকে অন্য কয়েদিদের থেকে আলাদা রাখা হয়েছে এবং কেবলমাত্র এক সন্ত্রাসবাদের দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদির সঙ্গে সীমিত আলাপের অনুমতি রয়েছে। তবে তিনি কখনও সেই সুযোগ নেননি।
কারাগারে তার কাছে টেলিভিশন, বই, ক্রোশের সামগ্রী, হেয়ার স্ট্রেইটনারসহ কিছু ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রয়েছে। তবুও প্রতিরক্ষা পক্ষ অভিযোগ করে, তিনি প্রতিদিন গড়ে ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা একা সেলে কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন এবং কারাগারের লাইব্রেরি ও ব্যায়ামাগারে পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না।
শাস্তির অপেক্ষায় এরিন
বিচারপতি ক্রিস্টোফার বিল মন্তব্য করেন, এরিনের অপরাধ ছিল “ভয়ঙ্কর ও হৃদয়বিদারক”, তবে তিনি দণ্ড নির্ধারণের সময় এরিনের বন্দিজীবনের কষ্টকেও বিবেচনায় রাখবেন। আদালত ঘোষণা করেছে, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর মেলবোর্নে এরিন প্যাটারসনের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে।