মেলবোর্ন, ১৪ অক্টোবর- পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে চলমান উত্তেজনা ও সংঘর্ষ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে-এই সংঘাতের নেপথ্যে আসলে কী ঘটছে?
দুই দেশের সীমান্ত বিরোধের মূল সূত্র ১৮৯৩ সালের দ্যুরান্ড লাইন চুক্তি। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে করা সেই সীমান্তরেখাকে আফগানিস্তান কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি। তাদের দাবি, এই রেখা পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলকে কৃত্রিমভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই কাবুল এই সীমান্তকে স্বীকৃতি না দিয়ে আসছে, যা দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাসের বীজ বপন করেছে।
সম্প্রতি উত্তেজনার বড় কারণ হয়ে উঠেছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তান অভিযোগ করছে, আফগান মাটিতে টিটিপির ঘাঁটি রয়েছে এবং সেখান থেকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। ইসলামাবাদের দাবি, আফগান তালেবান সরকার টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে ও প্রশ্রয় দিচ্ছে।
তবে কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আফগান তালেবান বলছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা এবং তারা অন্য দেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না।
দুই দেশের মধ্যে প্রায় ২,৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বড় অংশে পাকিস্তান কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। তবে আফগান বাহিনী ও সীমান্তবর্তী উপজাতিদের অনেকেই সেই বেড়া ভেঙে দিয়েছে বা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি চামান, তোরখাম ও স্পিন বোলদাক এলাকায় একাধিকবার গোলাগুলি হয়েছে, যাতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
সীমান্ত বন্ধ থাকায় দুই দেশের বাণিজ্য কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে আফগানিস্তানে। আফগান ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, পাকিস্তান রাজনৈতিক চাপ হিসেবে বাণিজ্য অবরোধ দিচ্ছে।
পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্কও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। পাকিস্তান প্রথমে তালেবান সরকারকে নীরব সমর্থন দিলেও এখন তাদের প্রতি নীতিগত আস্থা হারিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
চীন এই সংঘাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বেইজিংয়ের উদ্বেগের মূল কারণ, এই অঞ্চলে তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) প্রকল্প ও গোয়াদার বন্দর বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। চীন দুই দেশকেই সংযম বজায় রাখতে আহ্বান জানিয়েছে।
সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত হাজারো মানুষ গোলাগুলির কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। সীমান্ত বন্ধ থাকায় চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্কুল বন্ধ ও বাজার স্থবির হয়ে পড়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘাত শুধু নিরাপত্তাজনিত নয়; এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক অবিশ্বাস, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অর্থনৈতিক চাপ। উভয় দেশই এখন একে অপরকে দোষারোপ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিটিপি ইস্যুতে যদি উভয় দেশ কোনো যৌথ সমাধানে না আসে, তাহলে এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।