সেই চালককে ক্ষমা করলেন শোকার্ত পরিবার
মেলবোর্ন, ২৫ এপ্রিল- অস্ট্রেলিয়ায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু সাদ এর মৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনার পর নিহত শিশুটির পরিবারের মানবিকতা ও ক্ষমাশীলতায় প্রবাসী কমিউনিটিতে গভীর আলোচনার জন্ম…
মেলবোর্ন, ২৫ জানুয়ারি- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সরে যাওয়ার পর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে এর প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ ও আলোচনা বাড়ছে। স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলতে পারে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলসহ অন্তত ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার পর হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ছাড়ার নির্বাহী আদেশে সই করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে প্রায় এক বছর পর তা কার্যকর হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ এবং পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, সদস্যপদ বাতিলের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর আগেই দেশটি ডব্লিউএইচওতে সব ধরনের তহবিল দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে যে সাফল্যগুলো এসেছে তার বড় একটি অংশেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি, আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা রয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর বিভিন্ন কার্যক্রমে কাটছাঁট শুরু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, এর প্রভাব পড়তে পারে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং ল্যাবরেটরি সাপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে। এসব ক্ষেত্র বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বে-নজির আহমেদ মনে করেন, সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় এখনই রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। তার মতে, যেই সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের বিকল্প অর্থায়ন এবং স্বাস্থ্য খাতে অভ্যন্তরীণ বরাদ্দ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তোলা এবং নীতিমালা প্রণয়নে দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা দিয়ে আসছে। সংস্থাটির প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস ইতোমধ্যেই সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ বাতিলের ফলে ডব্লিউএইচও বড় ধরনের তহবিল সংকটে পড়বে। সেই ঘাটতি সামাল দিতে সংস্থাটিকে ইতোমধ্যে কিছু কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করতে হয়েছে।
বাংলাদেশে এর প্রভাব কতটা হতে পারে, তা বোঝাতে সাম্প্রতিক কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছরের অক্টোবরে দেশে প্রায় পাঁচ কোটি শিশুকে বিনামূল্যে টাইফয়েড টিকা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বড় ভূমিকা ছিল। গ্যাভির মাধ্যমে বাংলাদেশ এই টিকা পেয়েছিল ডব্লিউএইচওর সহায়তায়।
এর আগে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সরকার, ইউনিসেফ, গ্যাভি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি চালু হয়। সেই কর্মসূচির আওতায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় এক কোটির বেশি মেয়েকে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কোভিড মহামারির সময়ও বাংলাদেশ দ্রুত ভ্যাকসিন পেতে এবং মহামারি মোকাবিলার নির্দেশনা তৈরি করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পেয়েছিল। বিশেষ করে মহামারি ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে, যা কোভিড পরিস্থিতিতে কাজে আসে বলে জানান মুশতাক হোসেন।
তার ভাষায়, মহামারি বা বড় রোগ প্রাদুর্ভাবের সময় কী করতে হবে, কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে, এমনকি জাতীয় নীতিমালা তৈরিতেও বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিকনির্দেশনা থেকে উপকৃত হয়েছে।
২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ সরকার সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, ভ্যাকসিন উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের শক্তিশালীকরণ এবং কমিউনিটি ক্লিনিককে জনস্বাস্থ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরও সহায়তা চেয়েছিল।
বাংলাদেশের অন্যতম সফল কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে পোলিও, ফাইলেরিয়া ও কালাজ্বর নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। হাম ও কনজেনিটাল রুবেলা সিনড্রোম নির্মূলের কর্মসূচিতেও সংস্থাটি সহায়তা দিয়েছে। ফাইলেরিয়া ও কালাজ্বর নির্মূলের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে সনদও দিয়েছে।
এ ছাড়া যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, নিপাহ ভাইরাস, বার্ড ফ্লু, অসংক্রামক রোগ, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যসহ নানা খাতে কয়েক দশক ধরে ডব্লিউএইচও বাংলাদেশকে সহায়তা করে আসছে।
বে-নজির আহমেদের মতে, প্রায় ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সাফল্যের সঙ্গে এই সংস্থার অবদান জড়িয়ে আছে। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গড়ে তোলাও এর বড় উদাহরণ। এখন যদি তহবিল সংকটে এসব কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে নির্মূল হওয়া বা নির্মূলের পথে থাকা রোগগুলো আবার ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মুশতাক হোসেন বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল বন্ধের প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যক্রম আরও সংকুচিত হলে পাবলিক হেলথ, জরুরি সাড়া ব্যবস্থা এবং গবেষণাগারভিত্তিক সহায়তা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। সম্প্রসারিত টিকাদান, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগ গবেষণার বাজেট কমে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের জন্য স্বাস্থ্য খাতে অভ্যন্তরীণ বরাদ্দ বাড়ানো এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। নইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশে ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে স্বাস্থ্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি দেশটি রোগ পর্যবেক্ষণ, রোগনির্ণয় ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছে। তবুও ডব্লিউএইচও থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের মতো বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতেও যে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তা মানছেন প্রায় সবাই।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au