ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে গভীর অর্থসংকটে জাতিসংঘ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩১ জানুয়ারি- বার্ষিক চাঁদা পরিশোধে ব্যাপক বকেয়া এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে জাতিসংঘ একটি ‘অত্যাসন্ন আর্থিক ধসের’ মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। চলতি সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রকে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি বলেন, সংস্থাটির সামনে এখন বাস্তব ও গুরুতর আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে, যা অব্যাহত থাকলে কার্যক্রম চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।
চিঠিতে গুতেরেস সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে দুটি পথের কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। একদিকে রয়েছে জাতিসংঘের আর্থিক বিধিবিধানের মৌলিক সংস্কারে একমত হওয়া, অন্যদিকে রয়েছে সংস্থাটির আর্থিক পতনের বাস্তব সম্ভাবনা মেনে নেওয়া। একই সঙ্গে তিনি সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে সময়মতো ও পূর্ণাঙ্গভাবে বার্ষিক চাঁদা পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছেন।
এই চিঠি নিয়ে শুক্রবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের এক মুখপাত্র বলেন, চাঁদা পরিশোধের জন্য এটি এখনই সময়, নইলে হয়তো আর কখনোই নয়। জাতিসংঘের উপমুখপাত্র ফারহান হক সাংবাদিকদের জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেভাবে সংস্থাটি তার কার্যক্রম পরিচালনা করে এসেছে, তা বজায় রাখার মতো নগদ অর্থ বা তারল্য এখন আর নেই। তিনি বলেন, মহাসচিব প্রতিবছরই ক্রমবর্ধমান জোরালো ভাষায় এই সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন।
এই আর্থিক চাপ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমানোর নীতিতে এগোচ্ছেন। চলতি মাসেই ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক জাতিসংঘ সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ট্রাম্প সম্প্রতি ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন উদ্যোগ চালু করেছেন, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে জাতিসংঘকে কার্যত কোণঠাসা করার কৌশলই প্রতিফলিত হচ্ছে।
যদিও গুতেরেস তাঁর চিঠিতে সরাসরি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করে দায় দেননি, তবে তাঁর এই আহ্বান এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা হওয়া সত্ত্বেও অর্থায়ন কমানোর পথে হাঁটছে। জাতিসংঘের মূল বাজেটের ২২ শতাংশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র, আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ দেয় চীন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জাতিসংঘ বিষয়ক পরিচালক লুই শারবোনো এ পরিস্থিতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগটি অনেকটাই ‘পে-টু-প্লে’ ধরনের একটি বৈশ্বিক ক্লাবের মতো, যেখানে স্থায়ী সদস্য হতে ১০০ কোটি ডলার ফি দিতে হবে। শারবোনো বলেন, ট্রাম্পকে ১০০ কোটি ডলারের চেক দেওয়ার পরিবর্তে সরকারগুলোর উচিত জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিক আইন ও জবাবদিহি রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ৩৬টি দেশ ২০২৬ সালের নিয়মিত চাঁদা পুরোপুরি পরিশোধ করেছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বার্ষিক চাঁদা নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট দেশের মোট দেশজ উৎপাদন, ঋণের পরিমাণসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে।
গুতেরেস জানান, বকেয়া থাকা দেশগুলোর নাম প্রকাশ না করলেও ২০২৫ সাল শেষে মোট বকেয়া চাঁদার পরিমাণ রেকর্ড ১৫৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষায়, হয় সব সদস্যরাষ্ট্রকে পূর্ণাঙ্গ ও সময়মতো চাঁদা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, নতুবা আসন্ন আর্থিক পতন ঠেকাতে জাতিসংঘের আর্থিক কাঠামো আমূল সংস্কার করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
এই সংকট সামাল দিতে খরচ কমানোর উদ্যোগ হিসেবে চলতি জানুয়ারির শুরুতে জাতিসংঘ ২০২৬ সালের জন্য ৩৪৫ কোটি ডলারের বাজেট অনুমোদন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কম। তবু গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, এই পদক্ষেপ যথেষ্ট নাও হতে পারে এবং আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই সংস্থাটির নগদ অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার একটি বড় কারণ হলো জাতিসংঘের একটি সেকেলে নিয়ম, যার ফলে প্রতিবছর অব্যবহৃত কোটি কোটি ডলার চাঁদা সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে ফেরত দিতে হয়। এই কাঠামোগত দুর্বলতা ও চাঁদা বকেয়ার চাপ মিলিয়ে জাতিসংঘ এখন তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন আর্থিক পরীক্ষার মুখোমুখি।