ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ১১ মার্চ- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর সাম্প্রতিক ফোনালাপে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কোনো যুদ্ধবিরতির অনুরোধ তোলা হয়নি এবং ভবিষ্যৎ বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখও ঠিক করা হয়নি বলে জানিয়েছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মঙ্গলবার মস্কোতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
দিমিত্রি পেসকভ বলেন, সোমবার ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তবে ওই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির কোনো সরাসরি অনুরোধ জানানো হয়নি। একই সঙ্গে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের নতুন কোনো তারিখও নির্ধারণ করা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে পেসকভ বলেন, ইউক্রেন সংকট সমাধানের প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যে উদ্যোগ নিচ্ছে, তার জন্য মস্কো ওয়াশিংটনের প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন এই মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং রাশিয়াও চায় এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক।
পেসকভের ভাষায়, “প্রেসিডেন্ট পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করেন। আমরা এর জন্য কৃতজ্ঞ এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক, সেটিই আমরা চাই।”
তিনি আরও বলেন, কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে কিয়েভ সাময়িক যুদ্ধবিরতি চেয়েছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়। তবে ট্রাম্প-পুতিন ফোনালাপে এ ধরনের কোনো শর্ত বা প্রস্তাব আলোচনা হয়নি।
পেসকভ বলেন, যুদ্ধবিরতির সম্ভাব্য কাঠামো ও শর্তাবলি নিয়ে আগেই বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে পরিষ্কার।
রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল করার প্রসঙ্গও ফোনালাপে বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়নি বলে জানান ক্রেমলিনের এই মুখপাত্র। তিনি বলেন, তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত, বিশেষ করে পারস্য উপসাগর অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে।
পেসকভ বলেন, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলার অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফোনালাপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে পেসকভ বলেন, দ্রুত যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সবাই আগ্রহী। তাঁর ভাষায়, “সত্যি বলতে, দ্রুত যুদ্ধবিরতি হলে সবাই উপকৃত হবে। এ নিয়ে তর্ক করার খুব বেশি সুযোগ নেই।”
তবে তিনি বলেন, ফোনালাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে ত্রিপক্ষীয় সংলাপের কাঠামো চালু রাখা প্রয়োজন। এই কাঠামোর মাধ্যমে আলোচনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আগ্রহ রয়েছে।
পেসকভ জানান, ভবিষ্যৎ বৈঠক কোথায় এবং কবে হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং এই সংলাপের ধারা বজায় রাখার বিষয়ে সবাই আগ্রহী।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং কূটনৈতিক আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত প্রসঙ্গে পেসকভ বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই প্রেসিডেন্ট পুতিন উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতার বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, রাশিয়ার দেওয়া অনেক প্রস্তাব এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে এবং সেগুলো প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুতিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। কারণ এ ধরনের ভূমিকা পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে একাধিক সমঝোতা ও চুক্তি প্রয়োজন।
পেসকভ বলেন, “এই ধরনের মধ্যস্থতার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের বোঝাপড়া ও চুক্তি দরকার। তাই পরিস্থিতি পরিষ্কার হতে কিছুটা সময় লাগবে।”
রাশিয়া কী ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। তবে বলেন, মস্কো তার সামর্থ্যের মধ্যে থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত নিরসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে বলে যে অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান পেসকভ।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলা শুরু করে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি-ও রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা থাকা দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ www.aa.com