ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বাড়ছে।
মেলবোর্ন, ১১ মার্চ- ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আজ সবচেয়ে তীব্র হামলা চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর দশম দিনে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রবাহিনী ইরানের ওপর নতুন করে শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত। মঙ্গলবার পেন্টাগনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরান আগের তুলনায় সবচেয়ে কম অস্ত্র ব্যবহার করেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সংঘাত কমে এসেছে। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখন আরও সমন্বিত ও শক্তিশালী আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, চলমান সংঘাতের ফলাফল শেষ পর্যন্ত আমেরিকার পক্ষেই যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কোনো ধরনের ‘পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল’ মেনে নেবে না।
একই সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নির্দেশে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে নিহত মার্কিন সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বক্তব্য শুরু করেন।
ড্যান কেইন বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী তিনটি প্রধান সামরিক লক্ষ্য সামনে রেখে অভিযান পরিচালনা করছে। প্রথমত, ইরান যেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বা মিত্রদেশগুলোর ওপর হামলা চালানোর আগেই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করা। দ্বিতীয়ত, ইরানের নৌবাহিনীকে দুর্বল করে দেওয়া এবং তাদের সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা। তৃতীয়ত, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে আগামী কয়েক বছর ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের ওপর বড় ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা হারায়।
তিনি জানান, যুদ্ধের শুরুর দিকের তুলনায় বর্তমানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হার প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। তাঁর মতে, ধারাবাহিক বিমান হামলা ও সামরিক অভিযানের কারণে ইরানের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী বিশেষভাবে ইরানের মাইন স্থাপনকারী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এ অভিযানকে তিনি ‘কঠিন ও নিরলস কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করে এতে অংশ নেওয়া সেনাদের প্রশংসা করেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের শিথিলতা দেখাবে না। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত করার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আগের তুলনায় ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী হামলা চালাবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেই সতর্কবার্তার পুনরাবৃত্তি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা জানতে চান, ইরানে চলমান হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এড়াতে পেন্টাগন কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে। জবাবে হেগসেথ বলেন, বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু না করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সতর্কতা অন্য কোনো দেশ গ্রহণ করে না। তাঁর দাবি, সামরিক অভিযানে বেসামরিক ক্ষতি এড়াতে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো ঘটনার বিষয়ে তদন্ত প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই করা হবে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা উন্মুক্ত তথ্যসূত্রকে ভিত্তি করে কোনো ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ করা যাবে না।
এদিকে ইরান সরকার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলে যে দাবি করেছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা যথাযথ সুরক্ষা ও পর্যাপ্ত রসদের মধ্যেই কাজ করছে। তিনি জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনাদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরঞ্জাম ও সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
জেনারেল ড্যান কেইনও বলেন, বর্তমানে মার্কিন বাহিনী তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করতে পারছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যেকোনো যুদ্ধক্ষেত্রেই ঝুঁকি সবসময় থাকে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার প্রসঙ্গ তুলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, এ ধরনের হামলা চালিয়ে ইরান বড় ধরনের কৌশলগত ভুল করেছে। তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপের ফলে ওই অঞ্চলের অনেক দেশ উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন আরও জোরালোভাবে প্রকাশ করছে।
হেগসেথ আরও বলেন, ইরানের নতুন নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা না করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সতর্কবার্তা মেনে চলা। এতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আহত হয়েছেন বলে যে গুজব ছড়িয়েছে, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। সবশেষে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, চলমান যুদ্ধ অন্তহীন নয়। তবে এটি এখন সংঘাতের শুরুতে রয়েছে নাকি শেষের দিকে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তাঁর নয়; সেটি সম্পূর্ণভাবে প্রেসিডেন্টের ওপর নির্ভর করছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান।