*/ ?>

প্রবাস দর্পন

বিশ্বাসের রং ও গভীরতা

  • 1:32 pm - March 15, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৫ বার

“শূন্যের রংধনু” নামে একটি এতিমখানা রয়েছে। যেখানে সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার হলেন প্রধান শিক্ষক ও পরিচালক, আর সহকারি শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক হচ্ছেন টর্নেডো তিতাস স্যার। ফারুক, আমিনুল, শিমুল, সাদিক, ইউসুফ, স্বেচ্ছা, বর্ণা, রানা, শরিফ, পলাশ ও আমি সহ আমরা মোট ১১৪ জন শিশু ছিলাম। আমরা ৮৬ জন গঙ্গা ও ২৮ জন যমুনা নদীর তীর থেকে এসেছি। তবে আমরা সবাই সরস্বতী নদীর তীর থেকে এসেছি বলে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এখানে মোট কক্ষ সংখ্যা ৩০টি। এই এতিমখানায় আমাদের দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন টর্নেডো তিতাস স্যার। এখানে আমাদের জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়। আমাদের প্রতিটি ক্লাসের দুটি অংশ থাকে। প্রথম অংশ এক শুক্রবার এবং অপর অংশ বা শেষ অংশ পরের শুক্রবার সম্পন্ন হয়ে থাকে। দুইজন স্যার একই সাথে ক্লাসে উপস্থিত থাকেন। এভাবেই আমাদের সকল ক্লাস চলতে থাকে। আমাদের সকল ক্লাসের মূল বিষয় হবে বিশ্বাসের রং ও গভীরতা নিয়ে। তবে বিশ্বাসের রং ও গভীরতা আলোকে প্রতিটি ক্লাসের আলাদা নাম দেওয়া হয়।

আজকের জন্য ক্লাস-১ এর নামকরণ করা হয়েছে,

“পর্দার আড়ালে ইশ্বরের জন্ম।”

ক্লাস-১ পর্দার আড়ালে ইশ্বরের জন্ম: এর প্রথম অংশ শুরু—

টর্নেডো তিতাস স্যার ক্লাস শুরু করলেন—

স্যার দেখলেন যে, আমিনুল বাদে আমরা সবাই ক্লাসে উপস্থিত হয়েছি। আমিনুলের সিট ছিল ফারুকের সিটের পাশেই। কিন্তু আজ সেই সিট শূন্য পড়ে রয়েছে। কারণ সে পর্দার আড়ালে চলে গেছে।

টর্নেডো তিতাস স্যার শুরুতেই বললেন, “আমি তোমাদেরকে জ্ঞান দিতে আসিনি তবে এসেছি তোমাদের মাঝে নিভিয়ে থাকা জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতে, যাতে তোমরা নিজেই প্রজ্জ্বলিত হয়ে অন্যকে আলো দিতে পারো।”
এরপর তিনি আরও বললেন, “তোমরা সবাই হৃদয়ের সকল দরজা-জানালা খুলে রাখো, যাতে করে তোমাদের ভিতরে সুপ্ত প্রদীপে আগুন দিতে আমি খুব সহজে প্রবেশ করতে পারি। যেমন আকাশের বুক ভেদ করে সূর্যের কিরণ ও বাতাসের বুক ভেদ করে বৃষ্টির ফোঁটা পৃথিবীতে আসতে পারে। তাই আমি সবার জন্য লেকচার দিতে আসিনি, এসেছি ঐ কয়েকজন বান্দা-বান্দির জন্য, যারা সর্বদাই হৃদয় খোলা রাখে ও নিশ্বাসের গতিবিধি বুঝে আমার কথাগুলো সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে পারবে।”

এরপর তিনি আরও বলেন, “ইমান হচ্ছে এমন একটি গায়েবি বিশ্বাস যেটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় না। তাই তোমরা এমন খোদার ওপর ইমান রেখে চলবে যাকে তোমরা বিশ্বাস কর। যাকে তোমরা মেনে নিতে পারবে। তাঁর সাথে তোমরা চুক্তি কর এবং তাকেই তোমাদের বিশ্বাসের একমাত্র সঠিক উত্তরটা দাও। কারণ তিনি তোমাদেরকে হতাশার শেষ সীমানায় নিয়ে যাবেন।” তারপর বলবেন, আমিতো শুরু থেকে এখানেই ছিলাম, এখানেই আছি এবং এখানেই থাকবো। তোমাদের হতাশা হওয়ার কিছু নেই কারণ তিনি ঐ রকমই। তাই তোমরা আশা হারাবে না।”

এরপর সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার টর্নেডো তিতাস স্যারকে বললেন, “তিতাস ভাই আপনি এই দুধের শিশুদের এতো বেশি ক্লাস নিয়েন না। বরং তাদেরকে ক্লাসের বাহিরে বাস্তব কাজের মাধ্যমে শিক্ষা দেন। কারণ তারা তো এখনও নিজেদের পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেই শিখেনি। তাই তাদের পক্ষে দৌড়ানো সম্ভব নয়।”
এবার টর্নেডো তিতাস স্যারকে বললেন, “কিন্তু কীভাবে স্যার?”
সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার বললেন, “আজ রাতে তাদেরকে শুধু স্যুপ খেতে দিয়েন।”
টর্নেডো তিতাস স্যারকে বললেন, “স্যার, এটা তো প্রায় তাদেরকে খেতে দিই।”
সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার বললেন, “আজ রাতে স্যুপ খেতে দিবেন কিন্তু তার সাথে চামচ ও অন্যান্য খাবার দিয়েন না। এতে করে আপনি একেকটি শিশুর মাঝে একেক রকম রি-অ্যাকশান দেখতে পাবেন। যেমন- কেউ বলবে যে তিতাস স্যার এর মতো টিচার দরকার নেই, কেউ বলবে স্যার এর দেখাশুনার মতো যোগ্যতা নেই, কেউ আপনার প্রতি রাগ করবে, কেউ আপনাকে অভিশাপ দিবে, কেউ আপনাকে ভেংচি কাটবে, কেউ তিরস্কার করবে, কেউ ধৈর্য ধরবে, আবার কেউ নিজের মতো করে চেষ্টা করতে থাকবে। আপনি শুধু চুপ করে তাদের রি-অ্যাকশানগুলো উপভোগ করবেন।”
টর্নেডো তিতাস স্যার সাম্যসাথী ভৌমিক স্যারকে বললেন, “ওকে স্যার।”
এরপর রাতে যখন আমরা ক্যান্টিনে খাবার খেতে যাই, তখন টর্নেডো তিতাস স্যার আমাদেরকে খাবার দিয়ে বললেন, “এক সমস্যার কারণে স্যুপ ছাড়া অন্যান্য খাবার এতিমখানায় আসেনি এবং আজ বিকেলে ক্যান্টিনে আকাশ থেকে এক পরী এসে সকল চামচ নিয়ে গেছে। তাই আজ তোমাদেরকে শুধু স্যুপ খেয়েই থাকতে হবে, তাও চামচ ছাড়াই খেতে হবে।”

আমরা অবাক হয়েই কিছুক্ষণ নীরব রইলাম। এরপর শরিফ বন্ধু শিমুলের দিকে আড়ি চোখে তাকিয়ে একটু উপহাস করে বলল, “বন্ধু আমি আসার সময় বাহিরে থেকে একটি চামচ সাথে করে করে নিয়ে এসেছি। এটা দিয়েই আমি খাওয়া শুরু করলাম।”
এবার শিমুল বন্ধু একটু কান্না চোখে স্যার এর দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার, চামচ না হলে কি করে খাবো?” এরপর স্বেচ্ছা বন্ধু বলল, “স্যার, আপনার ভালোবাসার প্রতি আমার যথেষ্ট বিশ্বাস রয়েছে যে, আপনি যেভাবেই হোক আমাদের জন্য চামচের একটা ব্যবস্থা অবশ্যই করবেন।”

বর্ণা, ইউসুফ ও সাদিক স্বেচ্ছার সাথে একমত পোষণ করে অপেক্ষাই রইলো। এদিকে রানা বন্ধু চা খাওয়ার মতো বাটিতেই মুখ লাগিয়ে একটু একটু করে খাওয়া শুরু করল। আর পলাশ মাথা থেকে টুপি খুলে বাটি থেকে স্যুপ একটু একটু করে টুপিতে ঢেলে খাওয়া শুরু করল। আমিও তাদের অবস্থা দেখে আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে স্যুপ খেতে চেষ্টা করতে থাকলাম। আর বাকি বন্ধুরা এক জোট হয়ে ধর্মঘট শুরু করলো কারণ চামচ না দিলে তারা আজ কোনো ভাবেই স্যুপ খাবে না।

সকলের রি-অ্যাকশান ও একেক রকম চেষ্টা তীক্ষ্ণভাবে অনুধাবন করার পর টর্নেডো তিতাস স্যার বলে উঠলেন, “তোমরা সবাই স্যুপের বাটি ওপরে জাগিয়ে তোল। এরপর সবাই বাটির নিচের তলায় তাকাও।”
স্যার এর কথা মতো আমরা সবাই বাটি ওপরে জাগিয়ে তুলে বাটির নিচের তলার পাশে তাকাতেই দেখি একটি করে চামচ আঠা দিয়ে বাটির সাথে তলায় লাগানো আছে। সাথে সাথে আমরা হতবাক হয়ে গেলাম। আর মনে মনে ভাবছিলাম যে, চামচ এখানেই ছিল, অথচ আমরা কেউ দেখতে পায়নি, কিন্তু এটা কি করে সম্ভব?

এবার টর্নেডো তিতাস স্যার বললেন, “এবার তোমাদের আশা তো পূরণ হয়েছে। কিন্তু আমি আগে থেকেই জানতাম যে চামচ এখানেই আছে কিন্তু পর্দার আড়ালে। কীভাবে তোমরা রি-অ্যাকশান দেখাও ও স্যুপ খাওয়ার জন্য কে কীভাবে চেষ্টা কর সেগুলো দেখার জন্য শুধু শুধু তোমাদের পরীক্ষা করে দেখছিলাম।”

আমরা সবাই লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে রইলাম, আর ভাবছিলাম যে, এই সামান্য চামচের জন্য আমরা স্যার এর সাথে কতই না খারাপ আচরণ করেছি, সত্যিই এইরূপ আচরণ করা আমাদের উচিত হয়নি। তাই আমরা সবাই একসাথে স্যার কে বিনয়ের সাথে সরি বললাম।
এরপর টর্নেডো তিতাস স্যার বললেন, “এখন তোমরা চামচ দিয়ে খেতে পারো। চামচ নেই সেটা নিশ্চিত জানার পরেও তোমাদের মাঝে যারা স্যুপ খাওয়ার জন্য অযথা বসে না থেকে, নিজেদের মতো করে চেষ্টা করেছে, তাদেরকে অনেক ধন্যবাদ। মনে রেখো, জীবনের প্রতিটি অপ্রাপ্তিগুলো এই রকমই হয়। সবগুলোই পর্দার আড়ালে আছে। যেমন খাবারের স্বাদ পর্দার আড়ালে আছে। আবার এতক্ষণ চামচগুলো যেমন পর্দার আড়ালে ছিল।”
আমি সহজে কোনো কিছু বুঝতে পারি না। তাই বেশি বেশি প্রশ্ন করি। হয়তো সেই কারণেই অল্প বয়সে আমার মাথার সব চুল পেকে গেছে। “পর্দার আড়ালে” শব্দের অর্থ সঠিক ভাবে বুঝতে না পেরে আমি স্যার এর কাছে “পর্দার আড়ালে” শব্দের সঠিক অর্থ সহজ ভাবে বুঝতে চাইলাম।
টর্নেডো তিতাস স্যার আমাকে বললেন, “তোমার নাম “রাকিবুল হাসান” পরিবর্তন করে *মৌলিক-পদার্থ* রাখা হল। এবার তুমি বল যে তাহলে তোমার নাম “রাকিবুল হাসান” এখন কোথায় গেল?”
আমি উত্তর দিলাম, অদৃশ্যের মাঝে হারিয়ে গেল।
টর্নেডো তিতাস স্যার বললেন, “এটাই পর্দার আড়াল, যা দৃশ্যমান বস্তুর আড়ালে অদৃশ্য রূপ।”
এরপর স্যার আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার মাথার সাদা চুলগুলো ধরে টানতে টানতে বললেন, “এই চুলগুলো সাদা হওয়ার পূর্বে এগুলো কালো চুল ছিল। কিন্তু আজ সেই কালো চুলগুলো কোথায় গেল?”
আমি উত্তর দিলাম, পর্দার আড়ালে।
এবার টর্নেডো তিতাস স্যার আমার উত্তরে খুশি হয়ে আমাকে ধন্যবাদ দিলেন। এরপর পলাশ বন্ধুকে বললেন, “তুমি কি বিয়ে করতে চাও? তোমার বউ কিন্তু এই পর্দার আড়ালেই রেডি আছে। বিশ্বাস কর পর্দার আড়ালেই আছে।”
আমরা সবাই পলাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলাম, আর লজ্জায় পলাশ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো।

এরপর টর্নেডো তিতাস স্যার শরিফ বন্ধুকে বললেন, “তুমি কি গাড়ি-বাড়ি চাও? সেটাও আছে পর্দার আড়ালে।”
এবার টর্নেডো তিতাস স্যার ইউসুফ বন্ধুকে বললেন, তুমি কি ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ চাও? সেটাও আছে পর্দার আড়ালে। এখানেই আছে কিন্তু তিনি দেন না। তিনি ইচ্ছে করেই তোমাদেরকে দেন না। কারণ আল্লাহ তোমাদের ধৈর্যের শেষ সীমা পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া দেখতে চান। তার কাছে সবই আছে। তাই তোমরা তাঁকে সন্দেহ করে যেখানে সেখানে খুঁজো না, কারণ তিনি তো সবখানেই আছেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে।”

—ক্লাসের প্রথম অংশ শেষ—ক্লাসের বিরতি—সামনে শুক্রবার পর্যন্ত—

পর্দার আড়ালে ইশ্বরের জন্ম:

ক্লাস-১: এর দ্বিতীয় অংশ শুরু—

আজ ক্লাস শুরু হওয়ার পূর্বেই সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার ও টর্নেডো তিতাস স্যার উপস্থিত হয়ে ক্লাসের প্রথম অংশ নিয়ে দুইজনে পর্যালোচনা শুরু করেছেন।
সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার ও টর্নেডো তিতাস স্যারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “সেই রাতে যেদিন শিশুরা চামচ না পেয়ে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, তার জন্য তারা পরে লজ্জিত হয়েছিল। কিন্তু আজ যদি তাদেরকে কোনো খাবার না দেওয়া হয় এতে তারা পূর্বের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। বরং তারা হাসতে হাসতে বলবে অসুবিধা নেই। কারণ আজ তারা শিশু থেকে কৈশোরে পদার্পণ করেছে। ফলে তাদের মাঝে এখন আপনি সন্তুষ্টির ছায়া দেখতে পাবেন। কারণ তারা অলরেডি আপনার কাছ থেকে শিখে ফেলেছে যে কীভাবে নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী হতে হয়, কীভাবে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়, যে কোনো কাজে হতাশা না হয়ে কীভাবে নিজের মতো করে চেষ্টা করতে হয়। অথচ আগের দিন রাতেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে লজ্জিত হয়েছিল।”
এরপর আমরা ক্লাসে উপস্থিত হতে না হতেই সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার ক্লাস শুরু করে দিলেন।
প্রথমেই স্বেচ্ছা বন্ধুকে সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার বললেন, “আজ রাতে তোমাদের খাবার দেওয়া হবে না। কারণ খাবার নেই।”
স্বেচ্ছা উত্তর দিল, “নো প্রবলেম স্যার”
সাথে সাথে রানা বন্ধুও বলল, “স্যার, আমরা তো প্রতি রাতেই খাবার খাই কিন্তু আজ না হয় খাবার না খেয়েই থাকলাম।”
এরপর বর্ণা বন্ধু বলল, “স্যার, মানুষ তো দিনে রোজা রাখে, আমরা না হয় আজ রাতেই রোজা রাখলাম।”

এরপর পলাশ বন্ধু বলল, “স্যার, আমাদের প্রত্যেকের উচিত মাঝে মাঝে রোজা রাখা। এতে করে আমরা না খেয়ে থাকার কষ্ট বুঝতে পারবো।”
এবার সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার শিমুল বন্ধু বলল, “আজ তোমাদের কোনো অভিযোগ নেই কেন?”
শিমুল বন্ধু উত্তর দিল, “স্যার, আমরা অভিযোগ করতে না করতেই যদি পর্দার আড়াল থেকে খাবার চলে আসে। তখন আবার আমাদেরকে লজ্জিত হতে হবে।”
এরপর স্যার লক্ষ্য করলেন, ফারুক সবার পিছলে একা একা বসে আছে এবং যে পাশে আমিনুলের সিট শূন্য হয়ে আছে, সেই দিকে তাকিয়ে কার সাথে যেন একা একা কথা বলতেছে।
তাই সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার ফারুক বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তুমি কার সাথে কথা বলছো?”
ফারুক বন্ধু উত্তর দিল, “স্যার, আমি তো আমিনুলের সাথে কথা বলতেছি।”
সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার ফারুক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলো, আমিনুল তো অনুপস্থিত। শুনেছি সে নাকি এপ্রিলেই মারা গেছে এবং তার সিট টাও খালি আছে। তাহলে তুমি তার সাথে কীভাবে কথা বললে?”
এবার ফারুক বন্ধু বললো, “স্যার, আমিনুল তো প্রতিদিন আমার পাশেই বসে থাকে। বিশ্বাস করুন আমি এতক্ষণ তার সাথেই কথা বলছিলাম। কারণ সে তো আমাদের মাঝেই আছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে।”
আমরা সবাই তার সুন্দর উত্তরে হতবাক হয়ে গেলাম। আর আমাদের চোখও অশ্রুতে ভিজে গেল। স্যার ফারুক বন্ধুকে তার সুন্দর উত্তরের জন্য অনেক ধন্যবাদ দিলেন।
এরপর আমাকে নীরব থাকতে দেখে সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার বললেন, “তোমার মন খারাপ কেন?”
সাথে সাথে ইউসুফ বন্ধু বলল, “স্যার, ওর নাম পরিবর্তন করে টর্নেডো তিতাস স্যার *মৌলিক-পদার্থ* রেখেছেন। তাই ওর মন খারাপ।”
সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার ইউসুফ বন্ধুকে বললেন, “কিন্তু কেন ওর নাম পরিবর্তন করা হল?”
ইউসুফ বন্ধু বলল, “কারণ সে ক্লাসে বেশি বেশি কথা বলে স্যার।”
সাথে সাথে শরিফ বন্ধু বলল, “স্যার, তার নাম পরিবর্তনের আরও একটি কারণ হচ্ছে অল্প বয়সে তার মাথার সব চুল পেকে গেছে।”
এবার সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাই বলে তুমি মন খারাপ করে এভাবে নীরব থাকবে।”
আমি বললাম, “স্যার, আমি তখনই বেশি কথা বলি, যখন আমি নীরব থাকি।”

এরপর সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার টর্নেডো তিতাস স্যার কে বললেন, “পর্দার আড়ালে ক্লাসের দ্বিতীয় অংশে এসে বিশ্বাসের রং ও গভীরতার বিষয়ে সকলের সচেতনতা মূলক সুন্দর উত্তরে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আপনি ছাত্রদেরকে সত্যিকার মানুষ হতে এভাবেই শিখাবেন। তাদের সাথে এভাবেই কথা বলবেন।”
এরপর আমাদের দিকে তাকিয়ে সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রশংসা করছি না। আমি চাই তোমরা যেন সঠিক শিক্ষা টা ধরণ করতে পারো। আমি বলছি না যে, তোমরা পরিকল্পনাহীন জীবন যাপন কর। তবে হ্যাঁ, তোমরা জীবন নিয়ে উত্তম পরিকল্পনা করার চেষ্টা কর। কিন্তু পাশাপাশি খোদা তায়ালার প্রতি ভরসাও রেখো।”
এরপর স্যার সাদিকের দিকে তাকিয়ে সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার বললেন, “শুনলাম আজ সকালে তোমরা নাকি শরিফকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি করেছো?”

এবার সাদিক বন্ধু বলল, “স্যার, আজ সকালে আমরা কয়েকজন বন্ধু গোপনে পরিকল্পনা করে, শরিফ বন্ধুর পরিষ্কার টি-শার্ট টি লুকিয়ে রেখে, ইউসুফ বন্ধুর টি-শার্ট টি রং দিয়ে মাখিয়ে শরিফ বন্ধুর টি-শার্ট এর জায়গায় রেখে দিয়েছিলাম। এরপর শরিফ বন্ধু এসে টি-শার্ট টি নিজের মনে করে রং মাখানো অবস্থা দেখে রেগে গিয়ে আমাদের সকল বন্ধুদেরকে গালাগালি করে বলে, “তোরা আমার টি-শার্ট এর কি খারাপ অবস্থা করেছিস।” তখন আমরা সবাই শুধু মুচকি হেসে টি-শার্ট টি নষ্টের কারণে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হয় সেটাই উপলব্ধি করছিলাম। যখন ইউসুফ বন্ধু শরিফ বন্ধুকে বলল “গতকাল ক্লাসে টর্নেডো তিতাস স্যার কি বলেছিলেন যে, সবকিছু আমাদের মাঝেই আছে কিন্তু পর্দার আড়ালে। সেটা তোর মনে নেই? তাই মনেকর যে, এই নোংরা টি-শার্ট টির পর্দার আড়ালে তোর পরিষ্কার টি-শার্ট টিও আছে।” সাথে সাথে ইউসুফ বন্ধুকে মারার জন্য শরিফ বন্ধু তেড়ে আসে। এরপর পরিস্থিতি খারাপ দেখে আমরা তার টি-শার্ট টি বাহির করে দিয়ে বলি, সর্বদাই মনে বিশ্বাস রাখিস, সব কিছুই আছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে। কিন্তু বড়ই আফসোস! তুই আগেই আমাদেরকে গালি দিয়ে ফেলেছিস। এরপর আমরা অনেক হাসাহাসি করি।”

এরপর সাম্যসাথী ভৌমিক স্যার আমাদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “শরিফকে নিয়ে তোমরা আর হাসাহাসি করবে না, কারণ ঐ বিষয়ে শরিফও এখন অনেক লজ্জিত। এখন আমি বুঝতে পারছি যে তোমাদের মাঝে বিশ্বাসের রং খুব সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। তাই এখন বিশ্বাসের গভীরতায় প্রবেশ করার পালা। কারণ ক্লাস শুরুর পূর্বে তোমরা শিশু ছিলে আর ক্লাস-১ এর প্রথম অংশ শেষ করার পর তোমরা শিশু থেকে কৈশোর এবং ক্লাস-১ এর দ্বিতীয় অংশ বা শেষ অংশ শেষ করার পর আজ তোমরা কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করেছো। এখন তোমাদেরকে নিয়ে নিশ্চিন্তে জ্ঞানের সাগরে যুদ্ধে নামা যাবে। কারণ আজ তোমরা সকল সত্য বুঝে গেছো যে, এই পৃথিবীর সব কিছুই হচ্ছে শুধু–খেলা, তামাশা, মায়া আর আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। তাই বিশ্বাসের রং ও গভীরতা নিয়ে আমাদের প্রথম ক্লাস এখানেই শেষ করা হল। *বিশ্বাসের রং ও গভীরতা* বিষয়ে আমাদের পরের ক্লাস বা ক্লাস-2 এর নাম *পর্দার আড়ালে ইশ্বরের মৃত্যু*। তোমাদের সকলের প্রতি অনেক আশীর্বাদ রইলো। ভাল থেকো। পরের ক্লাসে আবার দেখা হবে।—ইনশাল্লাহ

(ক্লাস-2 বা পর্দার আড়ালে ইশ্বরের মৃত্যু: –পড়ুন বাস্তবতার গভীরে সত্যের অনুসন্ধান বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে।)

লেখক- মৌলিক পদার্থ

এই শাখার আরও খবর

অস্ট্রেলিয়ায় ঈদুল ফিতর ২০ মার্চ

মেলবোর্ন, ১৪ মার্চ- আগামী ২০ মার্চ অস্ট্রেলিয়ায় পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এ বছর ঈদুল ফিতরের দিন নির্ধারণ করেছে অস্ট্রেলিয়ার ফতোয়া…

রাতের বেলায় এখন

পূর্ণিমা রাতের বেলায় এখন কিরণের নৌকো ভাসছে। আকাশে অনুভবী শশী হাসছে। অনুরাগী রশ্মি তার জ্যোৎস্না তরঙ্গে দুলছে। শ্বেত পালখানি আবেগী আঁখি খুলছে। আমি আলতো পরশের…

ইরানের পক্ষে পোস্টের অভিযোগে বাহরাইনে বাংলাদেশিসহ ছয় প্রবাসী গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ১০ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের পক্ষে পোস্ট ও ভিডিও শেয়ার করার অভিযোগে এক বাংলাদেশিসহ ছয়জন প্রবাসীকে গ্রেপ্তার করেছে বাহরাইন…

হৃদয়ে বাংলা

মেলবোর্ন, ৯ মার্চ: খুঁজে পাই বাংলা আমি বাঙালির ইতিহাসে সবুজ শ্যামল বাংলা আমার হৃদয়তটে ভাসে বাংলা আছে তরুণ প্রাণে,নতুন সূর্যালোকে লালন করে বাংলা আমায় মৃত্তিকার…

রাষ্ট্রের উদাসীনতায় আটকে বিচার, স্বজনদের নীরব কান্নাই যেন ‘তীব্র প্রতিবাদ’

মেলবোর্ন, ৬ মার্চ- যশোরে উদীচীর সম্মেলনে ভয়াবহ বোমা হামলার ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি বিচার প্রক্রিয়া। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা যায়নি, চূড়ান্ত শাস্তিও…

গর্ভপাতে কাতরাচ্ছে পৃথিবী

স্বর্গ থেকে ইরা নেমে এলো এক  মায়ের জঠোরে। মায়ের উষ্ণ আশ্রয়ে সেই নিষ্পাপ স্পন্দন পরিপূর্ণ হতে থাকলো- নাভি বন্ধনের অন্ধকার ঘর ছেড়ে পৃথিবীর আলো-বাতাসে মুক্ত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au