হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের প্রবাহ বন্ধ করলে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মেলবোর্ন, ১৫ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি খোলা এবং নিরাপদ রাখতে অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রণালির উপকূলে মার্কিন বাহিনী বোমা হামলা চালাবে এবং ইরানের যুদ্ধজাহাজ ও নৌযান লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ অব্যাহত রাখবে।
শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এসব কথা বলেন।
তিনি লিখেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেসব দেশই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে নৌবাহিনী পাঠাতে আগ্রহী হবে। ট্রাম্পের দাবি, এসব দেশের যুদ্ধজাহাজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, তিনি আশা করেন চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশ এই উদ্যোগে অংশ নেবে। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালিকে যেকোনো মূল্যে খোলা রাখতে হবে। সেই লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র প্রণালির উপকূলীয় এলাকায় বোমা হামলা চালাবে এবং ইরানের নৌবাহিনীর জাহাজ ও অন্যান্য সামরিক নৌযান লক্ষ্য করে ক্রমাগত গুলি ছুড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর কোনো দেশ বাস্তবে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে সম্মত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে প্রকাশিত এক সংবাদ প্রতিবেদন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হামলার ঘটনায় পাঁচটি মার্কিন বিমান আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে এবং সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, বিমানঘাঁটিতে কয়েকদিন আগে হামলার ঘটনা ঘটলেও সেখানে অবস্থান করা বিমানগুলো ধ্বংস হয়নি বা বড় ধরনের ক্ষতিও হয়নি। তার দাবি, পাঁচটি বিমানের মধ্যে চারটির প্রায় কোনো ক্ষতিই হয়নি এবং সেগুলো ইতোমধ্যে আবার উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত। আর একটি বিমানের কিছুটা বেশি ক্ষতি হলেও সেটিও শিগগিরই আকাশে উড়তে পারবে বলে তিনি জানান।
ট্রাম্প অভিযোগ করেন, কিছু সংবাদমাধ্যম ইচ্ছাকৃতভাবে এমন খবর প্রচার করছে যাতে মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তার ভাষায়, “মিডিয়া আসলে চায় যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে হেরে যাক।”
অন্যদিকে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভারতগামী দুটি জাহাজ নিরাপদে অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে ভারত। জাহাজ দুটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি বহন করছিল। ভারতের বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব রাজেশ কুমার সিনহা নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি জাহাজ শনিবার সকালে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে এবং বর্তমানে সেগুলো ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের বন্দরগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফথালি জানিয়েছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেশ কয়েকটি ভারতীয় জাহাজকে নিরাপদে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে উত্তেজনা সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে জাহাজ চলাচল এখনও অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার পরও খারগ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি স্বাভাবিকভাবে চলছে বলে দাবি করেছে ইরান। দেশটির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, খারগ দ্বীপে তেল কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি হয়নি এবং সেখান থেকে রপ্তানি সম্পূর্ণভাবে অব্যাহত রয়েছে।
খারগ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি এই দ্বীপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর পর সতর্ক করে দিয়েছে যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি অবরোধের চেষ্টা চালিয়ে যায়, তবে খারগ দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোও পরবর্তী হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং গ্যাস এই প্রণালির মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিতে যেকোনো ধরনের সংঘাত বা অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিতেও সরাসরি চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্রঃ রয়টার্স