ইরান জানিয়েছে, প্রণালীটি কেবল শত্রু ও তাদের মিত্রদের জাহাজের জন্য বন্ধ। তবে, ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পর ইরান তাদের এলপিজি ট্যাংকারগুলোকে বিরল ছাড় দিয়ে নিরাপদে পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে ,ছবি- সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৫ মার্চ- পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অবরোধ ভাঙতে একাধিক দেশকে নিয়ে একটি ‘মিত্র জোট’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এই প্রস্তাবে সরাসরি আপত্তি জানিয়েছে ফ্রান্স। দেশটি স্পষ্ট করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা তাদের নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের ১৫তম দিনেও হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে ফরাসি মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ‘না। বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই অবস্থান করছে। ফ্রান্সের অবস্থান অপরিবর্তিত : রক্ষণাত্মক, সুরক্ষামূলক’ ,ছবি- সংগৃহীত
শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে। তার মতে, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্য এই উদ্যোগে যুক্ত হতে পারে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ১০টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের খবর পুরোপুরি অস্বীকার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে ফরাসি মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ বর্তমানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই অবস্থান করছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ফ্রান্সের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তা সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক ও সুরক্ষামূলক। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য ট্রাম্পের ঘোষিত ‘মিত্র জোট’ গঠনের প্রচেষ্টার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতার শতভাগ ধ্বংস করে দিয়েছে। যদিও তিনি স্বীকার করেন, ইরান এখনও ড্রোন, সমুদ্র মাইন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে জলপথে হামলা চালাতে পারে।
ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে উপকূলীয় এলাকায় বোমাবর্ষণ করবে এবং ইরানি নৌযানগুলো ধ্বংস করবে।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী প্রধান আলিরেজা তাংসিরি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি, বরং সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘মিথ্যা’ বলেও সমালোচনা করেন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, প্রণালীটি কেবল শত্রু দেশ ও তাদের মিত্রদের জাহাজের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের প্রভাবশালী এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিল-এর সদস্য মহসেন রেজাই সতর্ক করে বলেছেন, কোনো আমেরিকান জাহাজের উপসাগরে প্রবেশের অধিকার নেই।
তবে কিছু দেশের জন্য ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তেহরান। ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পর ইরান তাদের কিছু জাহাজকে প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা জানিয়েছেন, এলপিজি বহনকারী দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী ট্যাংকার নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতহালি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-এর মধ্যে সরাসরি আলোচনার ফলেই এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে তুরস্কের মালিকানাধীন একটি জাহাজকেও একইভাবে পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে আরও অন্তত ১৪টি তুর্কি জাহাজ এখনও অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

সারা বিশ্বে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয় ছবিঃ আল-জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ সতর্ক করেছে, এই প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তা বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এলএনজি নাইট্রোজেনভিত্তিক সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল, যা বিশ্ব খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচারও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, মানবিক সহায়তাবাহী জাহাজ যদি নিরাপদে এই পথ পার হতে না পারে, তাহলে লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্য সংকটে পড়তে পারে।
লন্ডনের কিংস কলেজ-এর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দেওয়ার কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই। তার মতে, কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হলে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক সম্পদকে ইরানের সস্তা কিন্তু কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এদিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরানে অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। লেবাননসহ উপসাগরীয় অঞ্চলেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র : আল-জাজিরা।