হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের প্রবাহ বন্ধ করলে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মেলবোর্ন, ২২ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে না দেয়, তাহলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়ে সেগুলো ‘নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া’ হবে।
শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, কোনো ধরনের হুমকি ছাড়াই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান বিদ্যুৎ অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে এবং ধাপে ধাপে সবচেয়ে বড় কেন্দ্রগুলো থেকে হামলা শুরু করা হবে।
এর আগের দিনই তিনি ইরানে চলমান সামরিক অভিযান গুটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র একদিনের ব্যবধানে অবস্থান বদলে আরও কঠোর বার্তা দেওয়ায় পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দ্বৈত বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল নিয়ে মিত্র দেশগুলোকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে।
পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে এবং সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই সময়সীমা ইরানের অবকাঠামোর ওপর মার্কিন হামলার পরিধি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ইতোমধ্যেই চলমান হামলার কারণে ইরানের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকির জবাবে পাল্টা সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির খাতাম আল আনবিয়া সামরিক কমান্ড সদরদপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেল বা জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
বর্তমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নিয়ে মিশ্র বার্তা আসছে ওয়াশিংটন থেকে। একদিকে যুদ্ধ গুটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত, অন্যদিকে অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থান পরিবর্তনকে কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।
ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো দেশটির অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের কাছে অবস্থিত দামাভান্দ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৮৬৮ মেগাওয়াট। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের কেরমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৯১০ মেগাওয়াট এবং খুজেস্তান প্রদেশের রামিন তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৮৯০ মেগাওয়াট। দেশটির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বুশেহরের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট।
এর আগে চলতি মাসেই ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিড ধ্বংস করার সক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের বিদ্যুৎ সক্ষমতা ধ্বংস করে দিতে পারে এবং তা পুনর্গঠনে দেশটির ২৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে এই উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কূটনৈতিক সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নিতে পারে।