দেড় মাসের শিশুকন্যাকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৯ জুন- মাগুরায় চাঞ্চল্যকর এক ঘটনায় অর্থকষ্টের কারণে নিজের দেড় মাস বয়সী কন্যাশিশুকে স্ত্রীর অগোচরে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক বাবার বিরুদ্ধে। শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি আড়াল করতে তিনি স্ত্রীকে ‘জিন-পরি’ শিশুকে নিয়ে গেছে বলে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করেন। এমনকি বিষয়টিকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে ঝাড়ফুঁকেরও আয়োজন করেন। তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশের তৎপরতায় বিক্রি হয়ে যাওয়া শিশুটিকে উদ্ধার করে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি মাগুরা সদর উপজেলার বেরইল পলিতা ইউনিয়নের রামদেরগাতী গ্রামে ঘটেছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা সাগর হোসেন (৩৮), শিশুটির কথিত ক্রেতা শাহাবুর রহমান ও মনিরা খাতুন দম্পতি এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অভিযুক্ত এক হাসপাতাল কর্মচারীকে আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ মে মাত্র ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে নিজের দেড় মাস বয়সী কন্যাশিশু টুকটুকিকে মাগুরা সদর উপজেলার দক্ষিণ বীরপুর এলাকার শাহাবুর রহমান ও মনিরা খাতুন দম্পতির কাছে তুলে দেন সাগর হোসেন। পুরো ঘটনাটি গোপন রেখে তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের কিছুই জানাননি।
ঘটনার পর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শিশুকন্যাকে বিছানায় না পেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়েন মা তানজিলা খাতুন। তিনি স্বামীর কাছে সন্তানের খোঁজ জানতে চাইলে সাগর হোসেন দাবি করেন, ‘জিন-পরি’ শিশুটিকে নিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি এক ফকিরকে বাড়িতে এনে ঝাড়ফুঁকেরও ব্যবস্থা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে সন্তানের হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় মায়ের মনে সন্দেহ দেখা দেয়। নানা অসঙ্গতি লক্ষ্য করে তিনি বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। একপর্যায়ে বাড়ির পাশের শত্রুজিতপুর পুলিশ ক্যাম্পে অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর মাগুরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করা হয়। পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেনের নির্দেশনায় তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালানো হয়।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে শিশুটিকে বিক্রি করা হয়েছে। পরে বৃহস্পতিবার অভিযান চালিয়ে মাগুরা সদর উপজেলার দক্ষিণ বীরপুর এলাকা থেকে শিশুকন্যা টুকটুকিকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার শেষে তাকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পর সন্তানকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মা তানজিলা খাতুন এবং তার স্বজনরা। এ সময় উপস্থিত অনেকের চোখেও অশ্রু দেখা যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শিশুটির বাবা সাগর হোসেন, ক্রেতা শাহাবুর রহমান ও মনিরা খাতুন এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অভিযুক্ত মাগুরা সদর হাসপাতালের কর্মচারী সুজয়কে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শিশুটিকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিশুটির ক্রয়-বিক্রয়ের ঘটনায় জড়িত চারজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য কখনোই সন্তান বিক্রির অজুহাত হতে পারে না। এটি একটি জঘন্য এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
তিনি আরও বলেন, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ক্রেতা দম্পতি দাবি করেছেন, তারা গরু বিক্রি করে শিশুটিকে কিনেছেন। তবে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, শিশুটিকে অন্য কোথাও পাচারের পরিকল্পনা ছিল কি না কিংবা এর সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শিশুটির মা তানজিলা খাতুন বলেন, এর আগে তার দুটি সন্তান রয়েছে। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের মাত্র ১৩ মাসের মধ্যে তৃতীয় সন্তানের জন্ম হওয়ায় তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। আগের সন্তানদেরও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হওয়ায় চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয় বেড়ে যায়। দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট এবং পারিবারিক চাপের কারণেই তার স্বামী এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।
তবে স্বামীর কর্মকাণ্ডে কষ্ট ও ক্ষোভ প্রকাশ করে তানজিলা বলেন, “যত কষ্টই হোক, কোনো মা তার সন্তান অন্যের হাতে তুলে দিতে চায় না। আমার সন্তানকে ফিরে পেয়েছি, এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমার স্বামী ভুল করেছে। আমি চাই সে তার ভুল বুঝতে পারুক।”
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, অর্থনৈতিক সংকট যতই থাকুক, সন্তানের মতো অমূল্য সম্পদ বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।