পরীমনির সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পুলিশ কর্মকর্তা সাকলায়েন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৯ জুন- ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) এবং বর্তমানে ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে নৈতিকতাবহির্ভূত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ডিবির গুলশান বিভাগের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গোলাম সাকলায়েন একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে নৈতিকতাবহির্ভূত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়, যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালে। ওই বছরের ১৪ জুন ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা করেন পরীমনি। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েনকে। এর প্রায় দুই মাস পর ৪ আগস্ট রাজধানীর বনানীতে পরীমনির বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। সেদিন পরীমনি ও তাঁর সহযোগীদের আটক করা হয়। অভিযানের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, অভিযানের কয়েক দিন আগে পরীমনি প্রায় ১৮ ঘণ্টা সাকলায়েনের সরকারি বাসভবনে অবস্থান করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এরপরই গোলাম সাকলায়েনকে ডিবি থেকে সরিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) পশ্চিম বিভাগে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। একই বছরের ১৯ মার্চ তিনি লিখিত জবাব দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন করেন। ২৮ মার্চ তাঁর ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রাথমিক অনুসন্ধান ও শুনানির পর অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তিনি ১০ মার্চ তার জবাব দেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তদন্ত প্রতিবেদন, কারণ দর্শানোর জবাব এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুদণ্ড আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে মতামতের জন্য বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের কাছে পাঠানো হলে কমিশন তাঁকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পরামর্শ দেয়।
পরে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি চলতি বছরের ১৭ জুন গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর অনুমোদন দেন।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে দায়ের করা বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় একই বিধিমালার ৪(৩)(খ) বিধি অনুসারে তাঁকে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ সূচক গুরুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে আলোচিত এই ঘটনার পর অবশেষে বিভাগীয় তদন্তের ভিত্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো।