দেশে বাড়ছে হাম পরিস্থিতি, ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ মে- দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকলেও এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হামে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং চারজনের মৃত্যু হয়েছে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে আক্রান্ত হয়ে। সব মিলিয়ে দেশে হামে ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, এত দিন দেশের কয়েকটি জেলার তথ্য নিয়মিতভাবে যুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ পায়নি। রোববার নতুন করে বিভিন্ন জেলার তথ্য সংযুক্ত করায় মৃতের সংখ্যা একদিনেই ৪৬ বেড়ে যায়। বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৪৪ জন এবং নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৬৫ জন।
ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে সরকার দেশজুড়ে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, এখনো অনেক শিশু টিকার আওতায় আসেনি। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের দ্রুত যাচাই পদ্ধতি বা র্যাপিড কনভিনিয়েন্ট মনিটরিংয়ের তথ্যে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে এখনো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু হামের টিকা পায়নি।
সরেজমিন অনুসন্ধানে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় টিকাবঞ্চিত শিশুর বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকার একটি বাড়িতে ছোট ছোট কক্ষে বসবাসকারী ১৪টি নিম্নআয়ের পরিবারের মধ্যে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী পাঁচটি শিশুর সবাই টিকা পেয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় খান হাসান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত ক্যাম্প থেকে তারা টিকা নিয়েছে।

ঢাকার একটি হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে , ছবিঃ সংগৃহীত
তবে একই এলাকার কাছাকাছি কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বসবাসকারী লামিয়ার পরিবারের চিত্র ভিন্ন। ময়মনসিংহ থেকে এসে ফুটপাতে বসবাস শুরু করা লামিয়ার দুই সন্তান রয়েছে। এক শিশুর বয়স সাত মাস, অন্যটির আড়াই বছর। তিনি জানান, তাঁর কোনো সন্তানই হামের টিকা পায়নি। এমনকি কোথায় টিকা দেওয়া হচ্ছে, সেটিও তিনি জানেন না।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, টিকাদান কর্মসূচিতে প্রচার-প্রচারণার বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও দ্বিধা তৈরি হয়েছে। আগে নয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হলেও এবার ছয় মাস বয়স থেকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। অনেক মা-বাবা মনে করছেন, কম বয়সে টিকা দিলে শিশুর ক্ষতি হতে পারে। এই ভুল ধারণা দূর করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন ছিল, যা যথেষ্ট হয়নি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশের শহর ও নগর এলাকায় এই কর্মসূচি বিস্তৃত করা হয়, যা চলবে আগামী ২০ মে পর্যন্ত।
এই কর্মসূচির আওতায় এক কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করেছে, লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। তবে ইউনিসেফের দ্রুত যাচাই পদ্ধতির তথ্য বলছে, বাস্তবে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে রয়েছে।
গত শনিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হামবিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের টিকা বিভাগের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, টিকাদান কার্যক্রম চললেও শহর ও গ্রামের অনেক শিশু এখনো টিকা পায়নি। তিনি বলেন, বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করে টিকার আওতায় আনতে সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
রাজধানীর মিরপুরের ভাষানটেক বস্তিতে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তায় বেশির ভাগ শিশুই টিকা পেয়েছে। তবে অন্য এলাকাগুলোর চিত্র একই রকম নয়।
শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক শিশু নিয়মিত টিকাই পায়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা এক বাবা জানান, তাঁর আড়াই বছরের মেয়েকে নয় মাস বা ১৫ মাস বয়সে কোনো টিকা দেওয়া হয়নি। এখনো শিশুটি কোনো টিকা পায়নি। তবে কেন টিকা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি।
নরসিংদী থেকে আসা এক দম্পতি জানান, তাঁদের তিন বছরের সন্তানকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে। এ কারণে তাঁরা ধারণা করছেন, এখন টিকা দিলে ক্ষতি হতে পারে। তাই তাঁরা টিকা দেননি।
ফেনী থেকে আসা আরেক দম্পতি বলেন, তাঁদের ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নয় মাস বয়সে টিকা দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার টিকা দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে তাঁরা দ্বিধায় আছেন।
রাজধানীর শাহজাহানপুরের গাজী বস্তিতে গিয়ে দেখা গেছে, বহু শিশু এখনো টিকা পায়নি। সাত মাস বয়সী আয়েশা মনিরের বাবা সানোয়ার হোসেন বলেন, মোবাইলে কিছু ভিডিও দেখে তিনি টিকা সম্পর্কে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। তাই মেয়েকে টিকা দেননি।
একই বস্তির বাসিন্দা সুমাইয়া বেগম মনে করেন, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই তিনি তাঁর দেড় বছর ও চার বছর বয়সী দুই সন্তানকে টিকা দেননি। ওই বস্তির ১০টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র তিনজন টিকা পেয়েছে, বাকি সাতজন এখনো টিকার বাইরে।
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় নাতিকে নিয়ে ভিক্ষা করা লাইলী বেগম জানান, তাঁর দুই বছর চার মাস বয়সী নাতি নয়ন কোনো দিন হামের টিকা পায়নি। একই এলাকায় ফল বিক্রেতা রূপালী আক্তার বলেন, সারাদিন রাস্তায় থাকায় কখন কোথায় টিকা দেওয়া হয়, তা তিনি জানেন না। তাঁর তিন বছরের ছেলে তানভীরও এখনো টিকা পায়নি।

গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার বাইরেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন একটি উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেখানে এখনো দুই শতাধিক শিশু টিকার বাইরে রয়েছে। তাঁদের খুঁজে বের করে নতুন করে টিকাদান শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।
বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, সেখানে ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান শুরু হলেও এখনো প্রায় ৫ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেছেন, বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করে টিকা দেওয়ার জন্য সব জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সহযোগিতায় স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণাও বাড়ানো হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করছেন, শুধু টিকা কেন্দ্র খোলা রাখলেই হবে না, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আরও জোরালো প্রচারণা চালাতে হবে। অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, এলাকায় এলাকায় মাইকিং, গণমাধ্যমে প্রচার, র্যালি এবং সরাসরি মা-বাবার সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের যোগাযোগ বাড়াতে হবে। কেন ছয় মাস বয়স থেকেই টিকা প্রয়োজন, তা মানুষকে বোঝানো জরুরি। তা না হলে সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে দ্রুত শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টি, ভিটামিন এ-এর ঘাটতি এবং টিকাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি হওয়ায় এখনই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সূত্রঃ প্রথম আলো