মেলবোর্ন, ১১ মে- ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সদ্য অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে “মুসলিম নির্যাতন”, “মসজিদে হামলা”, “বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া” এবং “গণহারে পালিয়ে যাওয়া” সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে।
তবে দ্য ডিসেন্ট-এর বিস্তৃত ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব দাবির বড় একটি অংশই ভুয়া, বিভ্রান্তিকর অথবা সম্পূর্ণ ভিন্ন সময় ও ঘটনার ভিডিও। মোট ১৫টির মতো ভাইরাল ভিডিও যাচাই করে দেখা যায়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভিডিওগুলো পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে গুজবের বিস্তার
গত ৫ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়কে কেন্দ্র করে রাজ্যের কয়েকটি জেলায় বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের কিছু ফেসবুক পেজ ও ইউজার এসব ভিডিওকে “মুসলিম নির্যাতন” হিসেবে দাবি করে প্রচার করে, যার ফলে অনলাইন জগতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। দ্য ডিসেন্ট-এর বিশ্লেষণ বলছে, এসব ভিডিওর মাধ্যমে বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক মন্তব্যও বাড়তে থাকে।
মসজিদে অগ্নিসংযোগের দাবি: বাস্তবতা ভিন্ন
একটি বহুল শেয়ার হওয়া ভিডিওতে দাবি করা হয়, “ভারতের শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে মসজিদে আগুন দেওয়া হয়েছে”। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের নয়, বরং ভারতের কাশ্মীরের শ্রীনগরের হায়দারপোরা এলাকার “জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলুম” মাদরাসা ও মসজিদে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের পুরোনো দৃশ্য।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ১০ এপ্রিল ঘটে এবং সেখানে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
আরেকটি ভিডিও, যেখানে দাবি করা হয় “কলকাতায় মসজিদে হামলা হচ্ছে”, সেটিও ভুয়া। দ্য ডিসেন্টের যাচাই অনুযায়ী এটি আসলে পশ্চিমবঙ্গের ফলতা এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেস নেতা জাহাঙ্গীর খানের অফিস ভাঙচুরের ঘটনা, যা ইন্ডিয়া টুডে-তেও প্রকাশিত হয়েছিল।
মসজিদ ও মুসলিমদের ওপর হামলার নামে পুরোনো ভিডিও
দৈনিক ইনকিলাবসহ কিছু বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এসব ভিডিওতে দাবি করা হয় ভারতে মুসলিমদের ওপর মসজিদে নামাজ চলার সময় হামলা চলছে, কিন্তু দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত করেছে এগুলো পুরোনো ঘটনার ফুটেজ, সাম্প্রতিক নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। মসজিদের ভিডিওটি বাংলাদেশের বলা জানা গেছে।
একইভাবে “প্রহরী নিউজ” নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রচারিত ভিডিও, যেখানে দাবি করা হয় পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হচ্ছে, সেটি আসামের গোয়ালপাড়ায় ২০২৫ সালের উচ্ছেদ অভিযানের দৃশ্য।
আরও একটি ভিডিও, যেখানে পশ্চিমবঙ্গে সহিংসতা দেখানো হচ্ছে বলে দাবি করা হয়, সেটি ভারতের রাজস্থানের যোধপুরে ২০২৪ সালের একটি স্থানীয় সংঘর্ষের ভিডিও।

ছবিঃ দ্য ডিসেন্ট
অগ্নিকাণ্ড, সংঘর্ষ ও অন্যান্য দেশের ভিডিওকে পশ্চিমবঙ্গের ঘটনা বলা
দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, বিভ্রান্তি ছড়াতে বিভিন্ন দেশের পুরোনো ভিডিওও ব্যবহার করা হয়েছে।
একটি ভিডিও, যেখানে ঘরবাড়িতে আগুন লাগার দৃশ্য দেখানো হয়, সেটি আসলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার আক্রা স্টেশনের পাশে শর্ট সার্কিট থেকে লাগা আগুনের ঘটনা, যা নির্বাচনের আগেই ঘটেছিল।
আরেকটি ভিডিও, যেখানে দাবি করা হয় মুসলিমদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটি নেপালের ২০২৫ সালের একটি আন্দোলনের ভিডিও।
এছাড়া মধ্যমগ্রামে আগুন লাগার পুরোনো ভিডিও এবং উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে বিয়েবাড়িতে সংঘর্ষের দৃশ্যও ভুলভাবে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক সহিংসতা হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার দাবি: সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর
আরেকটি প্রচারিত ভিডিওতে দাবি করা হয়, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত চরমোনাই মাহফিল শেষে মুসল্লিদের নৌকায় ওঠার দৃশ্য, যা বহু আগেই ইন্টারনেটে ছিল।
আরেকটি ভিডিও, যেখানে বলা হয় সীমান্ত দিয়ে লোকজন বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, সেটি আসলে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় কালী প্রতিমা বিসর্জনের সময়ের দৃশ্য।
হুগলির দাদপুরে ইজতেমা উপলক্ষে মুসল্লিদের সমাবেশের ভিডিওকেও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের দৃশ্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
কবরস্থান ভাঙচুর ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা
একটি ভিডিওতে কবরস্থান ভাঙচুরকে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ওপর হামলা বলে দাবি করা হয়। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি দিল্লির একটি পুরোনো ঘটনা, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।
দ্য ডিসেন্ট বলছে, এসব ভিডিওকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরির উদ্দেশ্যে পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ডিজিটাল বিভ্রান্তির একটি বড় উদাহরণ।
নেপাল ও আসামের ভিডিও বিকৃতভাবে ব্যবহার
একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়, কলকাতায় মুসলিমদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এটি আসলে নেপালের ২০২৫ সালের আন্দোলনের দৃশ্য।
অন্য একটি ভিডিওতে বলা হয় মুসলিমদের বাড়িঘর ধ্বংস করা হচ্ছে, তবে সেটি আসামের সরকারি উচ্ছেদ অভিযানের ভিডিও।
পুরোনো সহিংসতা ও ভিন্ন রাজ্যের ঘটনা ব্যবহার করে বিভ্রান্তি
দ্য ডিসেন্ট জানিয়েছে, শুধু মসজিদ নয়, ঘরবাড়ি পোড়ানো ও সহিংসতার দাবিতেও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে।
একটি ভিডিওতে দাবি করা হয় পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হচ্ছে। কিন্তু এটি আসলে ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর ভারতের আসামের গোয়ালপাড়ায় উচ্ছেদ অভিযানের দৃশ্য।
আরেকটি ভিডিও, যেখানে দেখা যায় ভাঙচুর ও সংঘর্ষ, সেটিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বলা হলেও এটি ২০২৫ সালের ৪ মার্চ রাজস্থানের যোধপুরের একটি স্থানীয় সংঘর্ষের ঘটনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ভুয়া ভিডিও শুধু তথ্য বিভ্রান্তিই তৈরি করছে না, বরং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া ভিডিও শেয়ার করা এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
দ্য ডিসেন্ট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ঘটনাগুলো দেখায় কীভাবে রাজনৈতিক ঘটনার আড়ালে পুরোনো ও ভিন্ন দেশের ভিডিও ব্যবহার করে জনমনে ভুল ধারণা তৈরি করা হচ্ছে।
দ্য ডিসেন্ট-এর দীর্ঘ যাচাইয়ে স্পষ্ট হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম নির্যাতনের নামে ছড়ানো অধিকাংশ ভিডিও বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এগুলোর বড় অংশই পুরোনো, ভিন্ন দেশ বা ভিন্ন ঘটনার ভিডিও, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এ ধরনের অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে আঞ্চলিক সম্পর্ক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্রঃ দ্য ডিসেন্ট