মেলবোর্ন, ১১ মে- ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক সময় যে নামটি ছিল অপ্রতিরোধ্য প্রতিরোধের প্রতীক, সেই মমতা ব্যানার্জী এখন জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে রাজপথ কাঁপানো, বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের দুর্গ ভেঙে ইতিহাস সৃষ্টি করা এবং টানা পনেরো বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করার পর এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তিনি কি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, নাকি এটাই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার শেষ অধ্যায়ের সূচনা?
পশ্চিমবঙ্গের সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গেছে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছিলেন, তখন কয়েক কিলোমিটার দূরে নিজের বাসভবনে দাঁড়িয়ে মমতা ব্যানার্জী দেশের বাম, অতিবাম ও জাতীয় শক্তিগুলোর প্রতি বিজেপিবিরোধী বৃহত্তর ঐক্যের আহ্বান জানাচ্ছিলেন।
এক সময় যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছিলেন, সেই বামপন্থীদের প্রতিও তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এমনকি রাজনৈতিক আলোচনার জন্য কখন তাকে বাসায় পাওয়া যাবে, সেটিও প্রকাশ্যে জানিয়ে দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দৃশ্যই প্রমাণ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক বৃত্ত যেন পূর্ণ হয়েছে।
২০১১ সালে বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ঘটনাকে এখনও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়। কারণ, তার আগে অনেকেই বিশ্বাস করতেন, বামফ্রন্টকে নির্বাচন করে হারানো প্রায় অসম্ভব। রাজ্যের প্রশাসন, সমাজ, শিক্ষা, শ্রমিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক বলয় সব জায়গাতেই বামপন্থীদের গভীর প্রভাব ছিল। সেই শক্তিশালী কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রায় একক লড়াই করে মমতা ব্যানার্জী ক্ষমতায় এসেছিলেন।

মমতা ব্যানার্জী(বামে) ও শুভেন্দু অধিকারী(ডানে}। ছবি: বিবিসি
কিন্তু এখন সময় বদলেছে। এক সময়ের ‘সংগ্রামী বিরোধী নেত্রী’ মমতা ব্যানার্জী এখন দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন প্রশাসক। আর এই দীর্ঘ ক্ষমতাই তার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ছাত্ররাজনীতি থেকে। কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজে পড়ার সময় তিনি কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। মাত্র ২১ বছর বয়সে পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর দ্রুতই তিনি জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন।
১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় বিস্ফোরণ। কলকাতার যাদবপুর আসনে তিনি সিপিআইএমের প্রবীণ নেতা সোমনাথ চ্যাটার্জীকে হারিয়ে দেন। তখন তিনি ছিলেন প্রায় অচেনা এক তরুণী নেত্রী। আর সোমনাথ চ্যাটার্জী ছিলেন জাতীয় রাজনীতির অত্যন্ত প্রভাবশালী মুখ।
সেই জয়ের পরই মমতা ব্যানার্জী জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ভারতের কনিষ্ঠ সংসদ সদস্যদের একজন হন তিনি। দিল্লিতেও কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আসেন। বিশেষ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতি পান।
এরপরের বছরগুলোতে তার রাজনৈতিক পরিচয় আরও শক্তিশালী হয় ‘লড়াকু নেত্রী’ হিসেবে। সংসদে প্রতিবাদ, রাজপথে আন্দোলন, দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরোধিতা, এমনকি সংসদে নাটকীয় আচরণও তাকে আলোচনায় রেখেছে সবসময়।

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবিঃ সংগৃহীত
১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তৃণমূল কংগ্রেস। প্রথমদিকে অনেকেই এটিকে সাময়িক রাজনৈতিক উদ্যোগ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু খুব দ্রুতই দলটি পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়।
তবে মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে। বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পায়ন নীতির অংশ হিসেবে কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে যে গণআন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেটিকে তিনি জনবিস্ফোরণে রূপ দেন।
বিশেষ করে নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে ১৪ জন নিহত হওয়ার পর রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে বাম সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। মমতা ব্যানার্জী সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হন।
গ্রামের দরিদ্র কৃষক, নিম্নবিত্ত মানুষ এবং বাম শাসনে হতাশ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তিনি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার স্লোগান ছিল পরিবর্তনের। তিনি নিজেকে তুলে ধরেছিলেন সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টকে বড় ধাক্কা দেয়। আর ২০১১ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন মমতা। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
মমতা ব্যানার্জী হন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী। এরপর ২০১৬ ও ২০২১ সালেও বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় থাকেন।
কিন্তু ক্ষমতায় থাকার দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তার দল নানা দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়ে পড়ে। শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, কয়লা পাচার, গরু পাচার, আর্থিক দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজনীতি, কাটমানি অভিযোগসহ একের পর এক বিতর্ক তৃণমূল কংগ্রেসকে চাপে ফেলে।
এক সময় সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, দলের নেতারা দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও মমতা ব্যানার্জী ব্যক্তিগতভাবে সৎ। তার সাদা শাড়ি, হাওয়াই চটি, সাধারণ জীবনযাপন তাকে আলাদা ভাবমূর্তি দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
বিরোধীরা অভিযোগ তোলে, তিনি প্রশাসনকে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ করেছেন। সব সিদ্ধান্ত নিজের হাতে রাখতে চেয়েছেন। দল ও সরকারের ভেতরে ভিন্নমত সহ্য না করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
বিজেপি ও বামপন্থীরা আরও অভিযোগ করে, শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তার সরকার ব্যর্থ। বড় বিনিয়োগ পশ্চিমবঙ্গে আসেনি বলেও সমালোচনা রয়েছে।
এক সময় যে রাজপথের আন্দোলন তাকে ক্ষমতায় এনেছিল, সেই আন্দোলনের রাজনীতি ক্ষমতায় এসে তার জন্যই বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। কারণ বিরোধী রাজনীতির ভাষা আর প্রশাসনের ভাষা এক নয়। মমতা ব্যানার্জী এই দুই ভূমিকাকে সবসময় আলাদা করতে পারেননি বলেও সমালোচনা রয়েছে।
তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও আগের মতো নেই বলে মনে করা হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক পরাজয় প্রমাণ করেছে যে শুধু মমতার ব্যক্তিগত ইমেজ এখন আর দলকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

রাজনৈতিক সমাবেশে মমতা ব্যানার্জী। ছবিঃ সংগৃহীত
সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো দলীয় ঐক্য ধরে রাখা। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই বড় পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে ভাঙন শুরু হতে পারে। ইতোমধ্যেই অনেক নেতা বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এছাড়া অভিষেক ব্যানার্জী ফ্যাক্টরও এখন বড় আলোচনার বিষয়। মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো এবং তৃণমূলের অঘোষিত উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত অভিষেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, করপোরেট ধাঁচে দল পরিচালনা এবং অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। দলের ভেতরেও তার নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
বিভিন্ন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার নজরেও রয়েছেন অভিষেক। ফলে ভবিষ্যতে আইনি ও রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
তবে এখনও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, মমতা ব্যানার্জীকে এত দ্রুত রাজনৈতিকভাবে শেষ বলে দেওয়া ভুল হবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে এখনও তার বড় ভোটব্যাংক রয়েছে। তার দলের বিধায়ক, সংসদ সদস্য এবং সংগঠন কাঠামো এখনও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রথমত, তিনি কি দলকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন?
দ্বিতীয়ত, অভিষেক ব্যানার্জীকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক সামাল দিতে পারবেন কি না।
আর তৃতীয়ত, তিনি কি আবারও নিজেকে পুরনো সেই ‘সংগ্রামী বিরোধী নেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন?
এই তৃতীয় প্রশ্নটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মমতা ব্যানার্জীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার আন্দোলন করার ক্ষমতা। মানুষের আবেগ ধরতে পারা। রাজপথে নেমে ইস্যুকে রাজনৈতিক বিস্ফোরণে রূপ দেওয়া।
কিন্তু এখন তার বয়স ৭০ পেরিয়েছে। আগের মতো শারীরিক সক্ষমতা বা অদম্য পরিশ্রম করার শক্তি আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

মমতা ও অভিষেক। ছবিঃ সংগৃহীত
অন্যদিকে বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গে শক্তিশালী সংগঠন তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বিপুল অর্থবল, প্রচারযন্ত্র এবং রাজনৈতিক কৌশলের দিক থেকেও বিজেপি অনেক এগিয়ে।
তবু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি কখনও পুরোপুরি পূর্বানুমান মেনে চলে না। এই রাজ্যে বহুবার অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখা গেছে। এক সময় যাকে সবাই শেষ ভেবেছিল, সেই মমতা ব্যানার্জীই বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিলেন।
এখন প্রশ্ন একটাই, তিনি কি আবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারবেন? নাকি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তার যুগ সত্যিই শেষ হতে চলেছে?
এই উত্তর নির্ভর করছে শুধু রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নয়, বরং মমতা ব্যানার্জীর নিজের লড়াই করার মানসিকতা, দলকে পুনর্গঠনের সক্ষমতা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন, তার ওপরও।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা