হিন্দু শিক্ষকের বাড়ি থেকে স্ত্রী-সন্তানসহ ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৩ আগষ্ট- রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলেকে হত্যার ঘটনায় নতুন করে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। শুরুতে ঘটনাটি ডাকাতি বলে ধারণা করা হলেও নিহতের স্বজনদের দাবি, এটি কোনো সাধারণ ডাকাতির ঘটনা নয়। বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবি ও বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে চারজনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ তাঁদের।
শনিবার(২২ আগষ্ট) স্থানীয় সময় রাত ১০ টার দিকে তাদের ৪ জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানেও হত্যাকাণ্ডের আগে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওই শিক্ষককে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বজন ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, বাড়ি নির্মাণের সময় থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী সরাসরি দাবি করেছেন, বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদার টাকা নিয়ে একটি ঝামেলা হয়েছিল। তাঁর ধারণা, সেই বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদার টাকা নিয়ে বিরোধ হয়েছিল। এরপর পরিবারটি ওই বাড়িতে বসবাস করছিল। তাঁর অভিযোগ, বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে ঘটনাটিকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অবসরে যাওয়ার পর পেনশনের টাকা দিয়ে নতুন করে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এই সময় স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি গণপতি চক্রবর্তীর কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, হত্যাকাণ্ডের দিন ওই ব্যক্তিকে কয়েকজন সহযোগীসহ বাড়িটির আশপাশে দেখা গিয়েছিল।
প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঐ পরিবারের চার সদস্যের সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তাঁদের চারটি মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। বাড়ির মূল ফটকে তালা ঝুলছিল এবং ভেতরে ছিল অন্ধকার। কয়েক দিন ধরে বাড়ি থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে এবং দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় স্বজন ও স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের চার সদস্যই মারা গেছেন। মরদেহগুলো কয়েক দিন আগের বলে ধারণা করা হয়। বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুরের চিহ্ন ছিল। টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার রাখার জায়গাগুলোও ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, হত্যাকান্ডের শিকার আগামী চক্রবর্তীর লাশের অর্ধের বিবস্ত্র অবস্থায় ছিল। তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে কিনা সেব্যাপারটি পুলিশ তাদের ব্রিফিংএ এড়িয়ে গিয়েছে।

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যার খবরে স্বজনদের আহাজারি। ছবিঃ সংগৃহীত
নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। পরে নিজ বাড়িতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দিতেন। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেছিলেন। ছেলে আয়ুশ ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে পুলিশও ডাকাতির সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেয়। রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানিয়েছিলেন, বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার রাখার সম্ভাব্য স্থান এবং কিছু আসবাব ভাঙচুর করা হয়েছিল। এসব কারণে প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না যাওয়ার কথাও জানিয়েছিল পুলিশ।
এদিকে ঘটনার তদন্তের পর মাছুয়াপাড়া এলাকার মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবিঃ সংগৃহীত
অন্যদিকে পুলিশের দাবি, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই চারজনকে হত্যা করা হয়েছে।
রোববার(২৩ আগষ্ট) সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ দাবি করেন, দুই যুবক পাশের ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে পরিচয় গোপন রাখার জন্য তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ঘুমন্ত ছেলেকেও হত্যা করা হয় বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশ আরও দাবি করেছে, হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়িতে কিছু সময় অবস্থান করে, বাথরুমে গোসল করে এবং ইয়াবা সেবন করে। পরে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বের হয়ে সেগুলো একটি মন্দিরের পেছনে লুকিয়ে রাখে। তদন্তকে ভিন্ন খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়েছিল এবং আঙুলের ছাপ নষ্ট করার জন্য দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ।