রেসিং ট্র্যাকে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, অক্ষত অজিত কুমার
মেলবোর্ন, ২৪ আগষ্ট- ভারতের দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা অজিত কুমার ইউরোপের একটি রেসিং ট্র্যাকে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন। হাই-স্পিড এন্ডুরেন্স রেস চলাকালে তার রেসিং কারে যান্ত্রিক…
মেলবোর্ন, ২৩ আগষ্ট- সময় বয়ে চলে নিজস্ব গতিতে, কিন্তু কিছু ক্ষত সময়ের প্রলেপেও শুকোয় না। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতা আজও তাড়া করে বেড়ায় বাংলাদেশের বিবেকবান মানুষকে। সেই নারকীয় হামলায় ২৪ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল এবং আহত হয়েছিলেন তিন শতাধিক নেতাকর্মী। এই হামলার শিকার হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন নারী আন্দোলনের অগ্রপথিক, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী আইভি রহমান। ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৪ আগস্ট তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তাঁর সেই মর্মান্তিক বিদায় এবং পরিবারের ওপর নেমে আসা নির্মম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইতিহাস আজ দীর্ঘ ২২ বছরের এক নতুন বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে।
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী আইভি রহমানের আসল নাম জেবুন্নাহার আইভি হলেও তিনি ‘আইভি রহমান’ নামেই দেশজুড়ে পরিচিত। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর একটি আদুরে ডাক নাম ছিল—’আইভি’ (অনেকে তাঁকে স্নেহভরে ‘আইভি আপা’ বলেও ডাকতেন)। ১৯৩৪ সালের ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব থানার চণ্ডীবের গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আট বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। তাঁর বাবা জালাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এবং মা হাসিনা বেগম ছিলেন গৃহিণী।
আইভি রহমানের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সমৃদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া এই নেত্রী ১৯৬৯ সালে মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক এবং ১৯৮০ সালে মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি ও জাতীয় মহিলা সংস্থার সভানেত্রীর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিতে ও তাঁদের কল্যাণেও রাখেন ইতিবাচক ভূমিকা। জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন এই মহীয়সী নেত্রী। তবে সামাজিক সংগঠনের বাইরে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ই ছিল মুখ্য।
রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রভাগে থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো বড় পদে থেকে ক্ষমতার অহংকার দেখاননি; বরং সবসময় সাধারণ নেতাকর্মীদের সাথেই মিশে থাকতেন। অথচ সেই নেত্রীর ওপর নেমে এসেছিল ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত হামলা, আর মৃত্যুর পরও তাঁর পরিবারকে সহ্য করতে হয়েছিল অমানবিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।
শহীদ আইভি রহমানের ছেলে নাজমুল হাসান পাপণের কণ্ঠে তাঁর মায়ের মৃত্যুর স্মৃতিচারণা আজও যেকোনো বিবেকবান মানুষের চোখে অশ্রু ঝরায়। তাঁর বর্ণনা মতে, ঘটনার দিন খবর পেয়ে তিনি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান, সেখানে গিয়ে কোনো ডাক্তার বা নার্সকে দেখতে পাননি। এ সময় মাকে অন্য হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। পরবর্তীতে অনেকটা জোর করে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে চিকিৎসা দিতে বিলম্ব করা হয়। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তাঁর বাবা মরহুম জিল্লুর রহমানকে পর্যন্ত দু’দিন মাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। তৎকালীন সরকারের এই নির্মম ও নিষ্ঠুর আচরণ মানবতার সব সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে দীর্ঘ দুই দশক ধরে তাকিয়ে ছিল শহীদ পরিবারগুলো।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় রায় ঘোষণা করেছিলেন। সে সময় বিচারিক আদালতের রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়াও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছিল আরও ১১ জনকে।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশী ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের মোড় নেয়। এই ধারায় ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল মঞ্জুর করে বিচারিক আদালতের পূর্বের রায় বাতিল ঘোষণা করেন এবং মামলার সব আসামিকে খালাস দেন। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এই রায় বহাল রাখেন। ফলে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলে আসা এই আলোচিত মামলার বিচারিক পরিণতি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক খাতে প্রবাহিত হয়।
ভৈরবের মাটি আর মানুষের সঙ্গে আইভি রহমানের সম্পর্ক ছিল আত্মার। ভৈরবের ‘আইভি ভবন’ আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে চলছে। ভৈরববাসী আজও অশ্রু ও শ্রদ্ধায় তাঁদের প্রিয় নেত্রীকে স্মরণ করেন। কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচ, আদালতের রায়ের পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক পালাবদলের দোলাচল কি কখনো মুছে ফেলতে পারে একটি মায়ের বুক খালি হওয়ার বেদনা বা স্বজন হারানোর আর্তনাদ?
রাজনীতি আসে, সরকার বদলায়, মতাদর্শের সংঘাত ও আইনি প্রক্রিয়া নিজের গতিতে চলে; কিন্তু রক্তের দাগ ও মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। একুশে আগস্টের এই দীর্ঘ ২২ বছর পর দাঁড়িয়ে আজ আমাদের উপলব্ধি করা উচিত যে, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা বা ক্ষমতার পালাবদলের ঊর্ধ্বে ওঠে প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং মানবতাকে সমুন্নত রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শহীদ আইভি রহমানের রক্তে ভেজা স্মৃতি আজ আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে—রাষ্ট্র ও সমাজের রাজনীতি যেন আর কখনো এতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হয়ে না ওঠে।
(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au