দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নে ক্ষুব্ধ প্রতিমন্ত্রী, বললেন, ‘কার এত জ্বালা?’
মেলবোর্ন, ২৫ আগষ্ট- ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি জানতে…
মেলবোর্ন, ২৫ আগষ্ট- রংপুরে একই পরিবারের চারজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন দুটি তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পুলিশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর এক ইলেকট্রিশিয়ান ডেকে সেই সংযোগ সচল করা হয়। অন্যদিকে, ওটিএন বাংলার হাতে আসা একটি ম্যাসেঞ্জার বার্তায় দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডের সময় হিসেবে পুলিশের দেওয়া সময়ের পরও নিহত আগামী চক্রবর্তীর অ্যাকাউন্ট থেকে তার এক বন্ধুকে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। এসব তথ্য ঘিরে হত্যাকাণ্ডের সময় ও ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তের মধ্যেই এসব তথ্য সামনে এসেছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে পুলিশ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে গিয়ে দেখতে পায়, পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। পরে রাত ১টার দিকে এক ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে এনে সংযোগটি সচল করা হয়।
ওই ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মনের বাড়ি মাছুয়াপাড়া এলাকার জগদ্বন্ধু মন্দিরের পাশে। তিনি জানান, শনিবার রাতে পুলিশ বাড়িটিতে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন দেখতে পায়। পরে বেলাল নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী তাকে ফোন করে বাড়িটিতে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করে দিতে বলেন।
উজ্জ্বল কুমার বর্মন বলেন, রাত ১টার দিকে তিনি বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগের খুঁটির কাছে যান। সেখানে উঠে তিনি দেখতে পান, বৈদ্যুতিক সংযোগ খুলে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘লাইনটা খোলা, খুলে ফেলা, নিউট্রাল খুলে ফেলা।’
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি স্বাভাবিক কোনো ত্রুটি ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। উজ্জ্বল বলেন, বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন লুজ হলে সাধারণত সেটি ঝুলে থাকে বা স্পার্ক করে। কিন্তু এভাবে সংযোগ খুলে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে থাকতে তিনি আগে দেখেননি।

আগেই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ। ছবিঃ সংগৃহীত
এই তথ্য হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত তুলে ধরে বাড়িটিকে ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রাথমিক ধারণার কথা বলা হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ কেন এবং কারা বিচ্ছিন্ন করেছিল, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ভোররাতে আগামী চক্রবর্তীর অ্যাকাউন্ট থেকে বার্তা
শুধু বিদ্যুৎ সংযোগ নয়, হত্যাকাণ্ডের সময় নিয়েও নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ওটিএন বাংলার হাতে আসা একটি ম্যাসেঞ্জার স্ক্রিনশটে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৬ মিনিটে আগামী চক্রবর্তীর ম্যাসেঞ্জার অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর এক বন্ধুর কাছে একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘ঘুমাইছিস?’
এর কিছুক্ষণ পর শুক্রবার ভোর রাত ৫ টা ৫০ মিনিটে তার আইডি থেকে পাঠানো আরেকটি ম্যাসেজে তার বন্ধুকে লেখেন, ‘আমার বাসায় কারেন্ট নাই সারারাত। বিদ্যুতের কি জানি হয়েছে। সবার বাসায় কারেন্ট আছে, আমার বাসায় নাই। সারারাত জাগলাম।’

ভোরে বন্ধুকে পাঠানো ম্যাসেজ। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
বার্তাগুলো সত্যিই আগামী চক্রবর্তী নিজে পাঠিয়েছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল ফোন অন্য কেউ ব্যবহার করে এই বার্তা পাঠিয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
তবে স্বজনদের প্রশ্ন, যদি পুলিশের দাবি অনুযায়ী ওই সময়ের আগেই পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়ে থাকে, তাহলে রাত ২টা ৫৬ মিনিটে আগামী চক্রবর্তীর ম্যাসেঞ্জার অ্যাকাউন্ট থেকে বন্ধুকে বার্তা গেল কীভাবে?
আর যদি আগামী নিজেই বার্তাটি পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে ওই সময় পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
ফলে ম্যাসেঞ্জার বার্তাটি হত্যাকাণ্ডের সময় নির্ধারণ, নিহতদের মোবাইল ফোনের ব্যবহার এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। ছবি : কালবেলা
পুলিশের বক্তব্যে অস্পষ্টতা
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি পুলিশ আগে থেকেই জানত কি না, সে বিষয়েও স্পষ্টতা পাওয়া যায়নি।
রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘এটা আমরা জানি না। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কি না, এটা আমরা জানা নেই।’
অথচ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর পুলিশই একজন ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে এনে বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মন।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ কখন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, কে বা কারা তা খুলে রেখেছিল এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।

মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবিঃ সংগৃহীত
দুই যুবকের স্বীকারোক্তি, কিন্তু তদন্তে নতুন প্রশ্ন
এদিকে চারজনকে হত্যার ঘটনায় প্রতিবেশী দুই যুবক মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে তাদের আদালতে হাজির করা হয়।
পরে তারা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রংপুর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। নিজেদের দায় স্বীকার করায় তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
তিনি বলেন, আদালতে তারা বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে সেসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
জবানবন্দি শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে আদালত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তবে দুই যুবকের স্বীকারোক্তির পরও ঘটনাটির সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বিশেষ করে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ আগে থেকেই বিচ্ছিন্ন থাকা, রাত ২টা ৫৬ মিনিটে আগামী চক্রবর্তীর অ্যাকাউন্ট থেকে বার্তা পাঠানো, বাড়ির ভেতরের আলামত এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সময় নিয়ে তদন্তে আরও গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

হিন্দু শিক্ষকের বাড়ি থেকে স্ত্রী-সন্তানসহ ৪ জন।ছবি: সংগৃহীত
এখন মূল প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সংযোগ কে বিচ্ছিন্ন করেছিল? রাত ২টা ৫৬ মিনিটে আগামী চক্রবর্তীর অ্যাকাউন্ট থেকে বার্তা কে পাঠিয়েছিল? আর গ্রেপ্তার দুই যুবকের স্বীকারোক্তির সঙ্গে এসব আলামতের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না? তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au