তিব্বত সীমান্তে বন্যায় নেপালে লাশের সারি, নিখোঁজ শত শত
মেলবোর্ন, ২৭ আগষ্ট- নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।…
মেলবোর্ন, ২৭ আগষ্ট- রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনায় এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মাছুয়াপাড়া ও আশপাশের এলাকায় মাদক সেবন ও কেনাবেচা চলে আসছে। মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ববিরোধকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে আরও দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। তবে সর্বশেষ চার হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের অনেকেই মাদক কারবারিদের বিষয়ে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন।
চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি মাছুয়াপাড়ার পাশের তাঁতীপাড়ায় অটোরিকশাচালক আমিনুল ইসলামকে (৩৫) হত্যা করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, মাদকাসক্ত বিজয় মোহান্ত গাঁজা কাটার চাকুর আঘাতে আমিনুলকে হত্যা করেন। এর কয়েক মাস পর ১০ এপ্রিল মাছুয়াপাড়ায় পূর্ববিরোধের জেরে রাকিব হাসান (২০) নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরেই রাকিবকে হত্যা করা হয়েছিল।
রাকিব হত্যার পর মাছুয়াপাড়ায় দুটি বাড়ি ও ১০টি দোকানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। আতঙ্কে কয়েকটি পরিবারের সদস্য বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যান বলেও স্থানীয়রা জানান।
এরই মধ্যে গত ২২ আগস্ট মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এ ঘটনায় একই এলাকার মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্পর্কে তারা আত্মীয়। মুগ্ধ রংপুর সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কাজ করতেন। সিদ্ধার্থ প্রায় আট বছর ধরে একটি জুয়েলারি দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করতেন।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। গ্রেপ্তার দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। জবানবন্দিতে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
ধরাছোঁয়ার বাইরে মাদক কারবারিরা
চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুজন গ্রেপ্তার হলেও স্থানীয়ভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে পরিচিত ব্যক্তিদের অনেকে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ যার কাছ থেকে ইয়াবা কিনতেন বলে জানা গেছে, সেই প্রশান্ত ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হিসেবে পরিচিত অন্যরাও গা ঢাকা দিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের পর মাছুয়াপাড়ার অনেক বাসিন্দাই মাদক কারবারিদের বিষয়ে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। স্থানীয় অন্তত ২০ জন নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব বাসিন্দার অনেকেই নিরাপত্তার কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের নাম বলতে চান না।
তাঁদের ভাষ্য, মাছুয়াপাড়া ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় রাত পর্যন্ত মাদক সেবন ও কেনাবেচা চলে। বিশেষ করে শ্যামাসুন্দরী খালের ওপর থাকা দুটি সেতুর আশপাশে সন্ধ্যার পর মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। রাত ১১টা থেকে ১২টার পর ওই পথ দিয়ে চলাচল করতে স্থানীয়দের অনেকেই ভয় পান।
কামাল কাছনা, মাছুয়াপাড়া, বৈরাগীপাড়া, তাঁতীপাড়া ও নূরপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গাঁজা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও ইয়াবাও বিক্রি হয় বলে স্থানীয়রা জানান। গাঁজা সেবনকে অনেকেই গুরুতর অপরাধ হিসেবে না দেখায় রাতের বেলায় বিভিন্ন বয়সী মানুষকে একসঙ্গে বসে মাদক সেবন করতে দেখা যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস বলেন, তাঁর ছেলে কার কাছ থেকে মাদক কিনত, তা তিনি জানেন না। এসবের সঙ্গে কারা জড়িত, পুলিশই ভালো জানে। তিনি এলাকার তরুণদের মাদক থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
রংপুরে ৪৩ সীমান্তপথে মাদক প্রবেশের অভিযোগ
নিয়মিত অভিযান, গ্রেপ্তার ও মামলা হলেও ভারতীয় সীমান্তবর্তী রংপুর বিভাগের আট জেলায় মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্তবর্তী অন্তত ৪৩টি রুট ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করছে। পরে রংপুরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে এসব মাদক রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
রংপুর নগরীর কেডিসি, কেরানীপাড়া, নূরপুর, মহাদেবপুর, গোমস্তাপাড়া, আলমনগর কলোনি, সেন্ট্রাল রোড, শালবন মিস্ত্রিপাড়া, শাপলা চত্বর, চামড়াপট্টি, জুম্মাপাড়া, বাবুখাঁ, আমাশু কুকরুল, দর্শনা রেলগেট ও আলমনগর বাবুপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। নগরীর বাইরের হারাগাছ, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, গঙ্গাচড়া ও বদরগঞ্জ এলাকাতেও মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।
তিন মাসে গ্রেপ্তার ১,৬২৬
রংপুর মহানগর পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন মামলায় গত তিন মাসে ১ হাজার ৬২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুধু জুলাই মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে ১১ কেজি ৫২৫ গ্রাম গাঁজা, ৬৩১টি ইয়াবা, ৪১ দশমিক ৯ গ্রাম হেরোইন, ৩০টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ৭২ বোতল এসকাফ ও দুই লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক মূল্য ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫০ টাকা। এ সময় ৬০টি মাদক মামলা করা হয় এবং ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক প্রতিরোধের ঘাটতি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থান, সংঘবদ্ধ মাদক ও চোরাকারবারি চক্রের তৎপরতা, মাদক পাচারের বিভিন্ন রুট, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধের ঘাটতির কারণে রংপুর বিভাগে মাদকের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির রংপুর জেলা কমিটির আহ্বায়ক মো. আল মামুন বলেন, আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাগুলোতে তাঁরা মাদকের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন। তবে মাদকসেবী ও কারবারিদের যথাযথভাবে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না।
তিনি দাবি করেন, মাছুয়াপাড়ায় এর আগের হত্যাকাণ্ডটিও মাদককেন্দ্রিক ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে তাঁরা জানতে পেরেছিলেন, এলাকার বিপুলসংখ্যক পরিবার কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকে বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিলে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের ওপর এমন হামলা হয়তো ঠেকানো সম্ভব হতো।
রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, মাছুয়াপাড়ায় চারজন হত্যার পর প্রশান্তসহ কয়েকজন মাদক কারবারি আত্মগোপনে চলে গেছেন। তবে মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, রংপুর শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা এখন মাদক। শিক্ষক পরিবারের হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দুজনই মাদকাসক্ত এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন করতেন। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরেও তারা মাদক গ্রহণ করেছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, মাদক কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট বাহিনীর একক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশ করছে। মাদক পাচার বন্ধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু মাদক সরবরাহ বন্ধ করলেই হবে না, মাদকসেবীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগও নিতে হবে। মাদকাসক্তিকে একটি রোগ হিসেবে বিবেচনা করে চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
মাছুয়াপাড়ায় চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি এলাকাটিতে মাদকের উৎস, সরবরাহকারী ও কারবারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au