জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থান নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত সাংবাদিক ফারজানা রূপা, শ্যামল দত্ত ও মোজাম্মেল বাবু। তাঁদের মুক্তি এবং সব অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন (আইএফজে)। ছবি: ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন, ২৬ আগস্ট: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন ও অভ্যুত্থান নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ঘটনায় সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার জামিন আবেদন নাকচ করেছেন।
তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অবিলম্বে প্রত্যাহার এবং তাঁদের মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে) ও সংগঠনটির সহযোগী বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)।
আইএফজের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রসিকিউশনের আবেদনের পর ২৪ আগস্ট ওই তিন সাংবাদিককে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের বিপরীতে একটি ‘পাল্টা বয়ান’ তৈরিতে সহায়তা করার মাধ্যমে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ এনেছেন প্রসিকিউটররা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করাকে অভিযোগের ভিত্তি করার দাবি
প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার করা প্রশ্নের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন।
এই ঘটনাকে ভিত্তি করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে বলে আইএফজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
২০২৪ সাল থেকে আটক
একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাকে ২০২৪ সালে আটক করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৭ জুলাই ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ওপর অভিযানের সংবাদ পরিবেশনসংক্রান্ত পৃথক একটি ঘটনায় মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
ওই মামলায় প্রসিকিউশনের অভিযোগ, একাত্তর টেলিভিশনের একটি সংবাদে হতাহতের সংখ্যা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, দৈনিক ভোরের কাগজ-এর সাবেক সম্পাদক শ্যামল দত্তকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়। আইএফজে দাবি করেছে, সাংবাদিকতার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলকভাবে পৃথক হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের সম্প্রসারিত কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের অধীনে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারণ করে জুলাই অভ্যুত্থানে কথিত আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যদের বিচার শুরু করা হয়েছে।
আইএফজে জানিয়েছে, কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ট্রাইব্যুনালের সম্প্রসারিত এখতিয়ার এবং আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ড অনুসরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
‘সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে’
বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম তিন সাংবাদিককে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সংগঠনটি বলেছে, সাংবাদিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করতে হবে।
আইএফজে বলেছে, সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে মানবতাবিরোধী অপরাধের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য গভীর উদ্বেগজনক।
সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালকে সাংবাদিকদের ভয় দেখানো বা হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
আইএফজে তিন সাংবাদিকের অবিলম্বে মুক্তি, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাহার এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড অনুসরণের জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, আইএফজে বিশ্বের ১৪০টি দেশে ছয় লাখের বেশি সাংবাদিকের প্রতিনিধিত্বকারী একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন।
-ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্ট