নদী থেকে লাশ উদ্ধারের ছবি(সংগৃহীত)
মেলবোর্ন, ২৫ অক্টোবর- খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলায় নদী, খাল ও জলাশয় থেকে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। গত ২২ মাসে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও পিরোজপুর জেলায় বিভিন্ন জলাশয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৭৩টিরও বেশি মরদেহ। এর মধ্যে অন্তত ২৭ জনের পরিচয় আজও অজ্ঞাত রয়ে গেছে। পুলিশ বলছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থলভাগে হত্যার পর প্রমাণ গোপনের জন্য লাশ নদী বা খালে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
২০২৪ সালে এসব এলাকায় ৩৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়, আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৩৯টি লাশ। নৌপুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধারকৃত মরদেহের সংখ্যা ৭০। স্থানীয় সূত্র বলছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত খুলনা অঞ্চলে আরও অন্তত তিনটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।
সাম্প্রতিক উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৭ অক্টোবর দাকোপের বাজুয়ার চুনকুড়ি নদী থেকে আশিষ সরকারের বস্তাবন্দী মরদেহ, পাইকগাছার শিবসা নদী থেকে ইকরাম হোসেন নামে এক যুবকের লাশ এবং তার আগের দিন জিরবুনিয়া খাল থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো তিন ধরনের। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা ও হত্যাকাণ্ড। তবে হত্যার শিকারদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রাপ্তবয়স্ক। নবজাতকের লাশও মিলছে, যার অনেকগুলোর বয়স এক-দুই দিনের মধ্যেই। পূর্ণবয়স্ক মরদেহগুলো নদীতে ভেসে থাকার কারণে পচন ধরে যায় এবং পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। যেখানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায় ও নিখোঁজের ডায়েরি থাকে, সেসব ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হয়।
নৌপুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড স্থলভাগে ঘটানো হয়, পরবর্তীতে তথ্য-প্রমাণ লুকাতে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এসব তদন্তে জনবল সংকট বড় বাধা। খুলনা নৌপুলিশের সুপার ড. মঞ্জুর মোর্শেদ জানান, নদীতে দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা ও হত্যাকাণ্ড এই তিন ধরনের লাশই পাওয়া যায়, তবে হত্যাকাণ্ডের লাশের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এ বছর মাত্র আট মাসেই গত বছরের সমান সংখ্যক লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের ঘটনার পর খুলনাসহ আশপাশের জেলাগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। পূর্বে র্যাব ও পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা থাকলেও এখন সেই নজরদারি দেখা যাচ্ছে না। এতে আত্মগোপনে থাকা অপরাধীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং খুন-অপহরণের মতো অপরাধ বাড়ছে।
তিনি বলেন, “প্রতিদিনই নদীতে মানুষের লাশ ভেসে উঠছে। বিচার বিলম্বিত হওয়ায় অপরাধীরা ভয় হারিয়ে ফেলছে। পুলিশকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে লাশ শনাক্তকরণ ও অপরাধী সনাক্তে উদ্যোগ নিতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, পুলিশ ও নৌপুলিশের জনবল বাড়ানো এবং নদী ও সীমান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা জরুরি। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ডিএনএ ডেটাবেইস ও আধুনিক ল্যাবরেটরি ব্যবস্থারও প্রয়োজন রয়েছে।
এই ভয়াবহ প্রবণতা রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকারকর্মীদের।
সুত্রঃ ইত্তেফাক