মেলবোর্ন ৩১ জানুয়ারি- ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কর্পস বা ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড শুধু একটি সামরিক বাহিনী নয়। এটি একই সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম কেন্দ্র, যার মূল লক্ষ্য ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে ভেতর ও বাইরের সব ধরনের হুমকি থেকে রক্ষা করা। এই ভূমিকাই এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা সে বিষয়ে জোরালো আলোচনা চালাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ইরান দেশটিতে বসবাসরত আরও অন্তত ১০ জন ব্যক্তিকে টার্গেট করেছে, যাদের মধ্যে একজন ইরানি সাংবাদিকও রয়েছেন। এসব অভিযোগ ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্নালেনা বায়েরবক এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন প্রকাশ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করা হয়। তাদের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে এই বাহিনীর ভূমিকা।
বিশেষ করে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। নৈতিকতা পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যুর ঘটনায় ইরানজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তা কঠোরভাবে দমনে বিপ্লবী গার্ডের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, এই দমন-পীড়নের ধরন মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ।
এর আগে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দেশ হিসেবে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে হেজবুল্লাহসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন ও সহায়তা দিচ্ছে এই বাহিনী। এটিই ছিল প্রথমবার, যখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য একটি দেশের সরকারি সামরিক বাহিনীকে সন্ত্রাসী তকমা দেয়।
ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কী ?
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি কাজ করে, তবে সরাসরি জবাবদিহি করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কাছে। ইরানের প্রতিরক্ষা, বিদেশে সামরিক অভিযান এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে এই বাহিনী কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের সক্রিয় সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার। এর পাশাপাশি ছয় লাখের বেশি রিজার্ভ সেনা রয়েছে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক কার্যক্রমের একটি বড় অংশ এই বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে হিজবুল্লাহ, হুথি বিদ্রোহীসহ বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীকেও তারা সহায়তা দিয়ে থাকে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি।
সামরিক কার্যক্রমের বাইরে ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতেও বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব ব্যাপক। বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প, জ্বালানি খাত এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণ রয়েছে। এই বহুমুখী ক্ষমতা এবং সীমান্তের বাইরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগই ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ক্রমশ কঠোর অবস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করলে ইরান ও ইউরোপের সম্পর্ক আরও টানাপোড়েনের মুখে পড়তে পারে। তবে ইউরোপীয় নেতাদের ভাষায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতায় ভূমিকার প্রশ্নে আর নীরব থাকার সুযোগ নেই।
সূত্র: আলজাজিরা