মেলবোর্ন, ২৪ ফেব্রুয়ারি- বেসরকারিখাতের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান নগদ বিক্রির উদ্যোগে আর এগোলেন না আহসান এইচ মনসুর। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে নগদ ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংক–এর এই গভর্নর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে না পেরে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের অবসানের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মনসুর নগদ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কড়া অবস্থান নেন। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, একাধিক অডিট এবং উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে নজিরবিহীন তৎপরতা দেখা যায়। এমনকি নগদকে বিকাশের মতো কাঠামোয় রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও তিনি প্রকাশ্যে বলেন।
একপর্যায়ে নগদের অনুমোদন বাতিলের দাবিতে অর্থ উপদেষ্টার কাছেও যোগাযোগ করা হয়। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগীদের নিজস্ব পছন্দের এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের নির্দেশনা জারি হয়, যা কার্যত নগদকে বাইরে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে সমালোচিত হয়। তবে এসব পদক্ষেপের পরও নগদের কার্যক্রম আগের নিয়মেই চলতে থাকে। মালিকানা বা কাঠামোগত কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন না হওয়ায় গভর্নরের অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে।
নগদ হস্তান্তরের সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে আলোচনায় আসেন মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান। তার সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পর গত ৮ ফেব্রুয়ারি আরমান গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়ে অধিগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সম্ভাব্য বিনিয়োগের আগে নগদের আর্থিক ও পরিচালন অবস্থা মূল্যায়নে অডিটের অনুমতিও চান তিনি। নিজেকে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় সমন্বয়ক হিসেবে উল্লেখ করে ডিজিটাল ব্যাংক গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানান।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার কথিত অনিয়মের কারণে নগদ বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি প্রশাসনের অধীনে রয়েছে এবং যাচাই শেষে নতুন মালিকানায় হস্তান্তর হতে পারে। এজন্য একটি ফরেনসিক অডিটের প্রয়োজনীয়তার কথাও তোলেন তিনি।
তবে আরমানের বিনিয়োগ সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, দীর্ঘ সময় গুম থাকার পর এমন বড় বিনিয়োগের অর্থের উৎস, আইনি ও নীতিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আরমান ২০১৬ সালে মিরপুর থেকে তুলে নেওয়ার পর প্রায় আট বছর নিখোঁজ ছিলেন এবং ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট মুক্তি পান।
এদিকে গত ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট–এর চেম্বার জজ আদালতের বিচারপতি মো. রেজাউল হক আদেশ দেন, নগদে প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তবুও গভর্নর বিক্রির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চেয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
শেষ পর্যন্ত এক ইংরেজি দৈনিককে দেওয়া বক্তব্যে মনসুর বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ছিল নগদকে পুনরায় বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়া। তবে নতুন সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটি তাদের বিষয়। তার ভাষায়, নগদ আমাদের প্রতিষ্ঠান নয়; আমরা কেবল এটি পরিচালনা করছি। বর্তমানে এটি সরকারের মালিকানাধীন, সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগদের এক কর্মকর্তা বলেন, আদালতে বিচারাধীন কোনো বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গভর্নরের নেই। পাশাপাশি নগদের মালিকানা কাঠামো জটিল—সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডাক বিভাগ এবং নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক—এই তিন পক্ষের সম্মতি ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।
দেড় বছরের নানা তৎপরতার পরও নগদ ইস্যুতে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা মিলেনি। বিক্রির উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই দীর্ঘ প্রচেষ্টার বাস্তব লক্ষ্য কী ছিল এবং সামনে নগদের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।