যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত: অস্ট্রেলিয়া কি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে?
মেলবোর্ন, ৯ মার্চ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়া সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা…
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ানোর মধ্যে ইরানের হামলার শিকার পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের কাছ থেকে পাওয়া সামরিক সহায়তার অনুরোধ বিবেচনা করছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং জানিয়েছেন, এসব দেশের কিছু অনুরোধ এসেছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় ছয়টি দেশ—ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতার—ইরানের হামলার প্রভাবের মধ্যে পড়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে জানা গেছে।
পেনি ওং এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় এমন অনেক দেশও ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। এ কারণে এসব দেশ নিরাপত্তা সহায়তার জন্য অস্ট্রেলিয়ার কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেক দেশ যারা সরাসরি সংঘাতে অংশ নেয়নি, তারাও এই হামলার শিকার হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা সহায়তা চেয়েছে এবং আমরা সেই অনুরোধ বিবেচনা করছি।”
কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হতে পারে সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি। তবে সরকার যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তা প্রকাশ্যে জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা কৌশল বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান উদ্বেগ সম্ভবত ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, যা তেল অবকাঠামোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়ার ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা এখনো সীমিত। ‘LAND156’ নামে একটি প্রকল্প এ ক্ষেত্রে কাজ করছে, তবে এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে NASAMS নামে একটি স্বল্পপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনে একটি ছোট সেনাদলসহ এই ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা যেতে পারে।
ডেভিস বলেন, “তারা চাইলে ছোট একটি সেনাদল ও NASAMS ব্যবস্থা পাঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা করতে পারে।”
তবে সমুদ্রপথে যুদ্ধজাহাজ পাঠানো সম্ভব হলেও সেটি বাস্তবায়নে বেশি সময় লাগবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আরেকটি বিকল্প হতে পারে অস্ট্রেলিয়ার বেসরকারি কোম্পানিগুলোর তৈরি ড্রোনবিরোধী প্রযুক্তি উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বিক্রি করা, যা সরকারের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা ছাড়াই করা সম্ভব।
ডেভিসের মতে, প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকায় সীমিত পরিসরে NASAMS মোতায়েনই অস্ট্রেলিয়ার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পদক্ষেপ হতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা এমন পরিস্থিতি চাই না যেখানে অস্ট্রেলীয় সেনারা সরাসরি ইরানের ভেতরে মোতায়েন থাকবে। তারা যদি যায়ও, তা হবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্বে।”
পেনি ওং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক পদক্ষেপকে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিতে সমর্থন করেছে। তবে এই সমর্থন ইরানের ভেতরে স্থলযুদ্ধে সেনা পাঠানো পর্যন্ত যাবে না।
তিনি বলেন, “এটি ইরাক যুদ্ধের মতো নয় এবং আমরা হাওয়ার্ড সরকারের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। আমরা অস্ট্রেলীয় নারী-পুরুষকে স্থলযুদ্ধে পাঠানোর কথা বলছি না।”
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যদি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারত, তাহলে বর্তমান সামরিক পরিস্থিতি হয়তো তৈরি হতো না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকা উচিত।
তবে পেনি ওং বলেন, ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের অধিকার একমাত্র ইরানি জনগণেরই।
তিনি বলেন, “ইরানের ভবিষ্যৎ এবং তাদের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইরানি জনগণের। এটি শুধু নৈতিক অবস্থান নয়, বাস্তবতারও বিষয়। স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন সেই দেশের জনগণ তা সমর্থন করে।”
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের দেশে ফেরাতে কাজ করছে সরকার।
এ পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার অস্ট্রেলীয় নাগরিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে দেশে ফেরার জন্য নিবন্ধন করেছেন। দুবাই বিমানবন্দরে ইরানি ড্রোন হামলার পর কিছু সময়ের জন্য বিমান চলাচল বন্ধ থাকলেও এখন আংশিকভাবে চালু হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, ইতোমধ্যে দুবাই থেকে অন্তত নয়টি ফ্লাইট অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছে এবং আরও দুটি ফ্লাইট ছাড়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া কাতারের দোহা থেকে বাসে করে সৌদি আরবের রিয়াদে যাওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়েছে, যেখানে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী, অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের দেশে ফেরার সবচেয়ে কার্যকর উপায় এখনো বাণিজ্যিক ফ্লাইট ব্যবহার করা।
অন্যদিকে বিরোধী দলের ছায়া অর্থমন্ত্রী ক্লেয়ার চ্যান্ডলার বলেছেন, বিদেশে আটকে পড়া অস্ট্রেলীয়দের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সামরিক জোটগুলোর ভূমিকাও বাড়তে পারে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au