শুভ নববর্ষ। নতুন হোক মন, নতুন হোক দেশ। সম্পাদকীয়
মেলবোর্ন, ১৪ এপ্রিল: পহেলা বৈশাখ বাঙালির হৃদয়ের গভীরে গাঁথা এক আত্মপরিচয়ের আলোকবর্তিকা। পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাঙালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও চেতনার এক অনন্য প্রকাশ। নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে, যখন রমনার বটমূলে প্রতিধ্বনিত হয়-
“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো”,
তখন সোনালি সূর্যের আলো ধীরে ধীরে আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অপার্থিব আবেশে। সেই আলো শুধু প্রকৃতিকেই নয়, ছুঁয়ে যায় আমাদের অন্তরের গভীরতম কোণও-অন্ধকারে জমে থাকা ক্লান্তি আর বেদনার স্তরগুলোকে আলতো করে মুছে দেয়।
মনে হয়, যেন প্রকৃতি নিজেই নতুন করে আমাদের ডেকে বলে-ভুলে যাও সব গ্লানি, সব হতাশা, সব বিভেদের রেখা। সেই আলোয় ধুয়ে যায় জীবনের সব বিষাদ, আর নিঃশব্দে জেগে ওঠে নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা, নতুন পথচলার সাহস।
বাংলা নববর্ষের উৎসবের মূলে রয়েছে সার্বজনীনতা। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে এই দিনটি বাঙালিকে এক সূত্রে গেঁথে দেয়। গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ, শহরের মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা-ইলিশের আয়োজন কিংবা হালখাতার ঐতিহ্য-সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে এক বর্ণিল মিলনমেলা।
তবে আমাদের এই চিরন্তন বাঙালি সংস্কৃতির পথে বারবারই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক শ্রেণীর সংকীর্ণ মানসিকতার গোষ্ঠী, যারা তথাকথিত ধর্মীয় ব্যাখ্যার আড়ালে আমাদের শিকড়কে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। তারা চায় আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের উৎসব, আমাদের মিলনমেলাকে বিভেদের দেয়ালে আটকে দিতে।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী-বাঙালির সংস্কৃতি কখনোই এত সহজে মুছে ফেলা যায় না। প্রতিটি আঘাতের বিপরীতে, প্রতিটি সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে, বাঙালি আরও দৃঢ়ভাবে ফিরে আসে তার শিকড়ে। তবুও এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, এই চরমপন্থী প্রবণতাগুলো আমাদের চিরায়ত মূল্যবোধ-সাম্য, সহমর্মিতা ও মানবিকতার ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে, যেন সেগুলোকে ধীরে ধীরে ম্লান করে দিতে চায়।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই পহেলা বৈশাখ আমাদের কাছে হয়ে ওঠে এক শক্তির উৎস, এক পুনর্জাগরণের আহ্বান। বছরের এই একটি দিন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আমাদের প্রকৃত পরিচয় বিভাজনে নয়, মিলনে; ঘৃণায় নয়, ভালোবাসায়। যারা বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলার ঐতিহ্যকে হৃদয়ে ধারণ করে, তাদের জন্য এই দিনটি নতুন করে সাহস জোগায়-সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার। ঘৃণার ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে একতাবদ্ধ হওয়ার।
আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত-শুধু নতুন পোশাক পরা বা আনন্দ উদযাপন নয়, বরং নিজেদের ভেতরের অন্ধকার দূর করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক সমাজ গঠনে এগিয়ে যাওয়া। কারণ, প্রকৃত নববর্ষ তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন তা ব্যক্তি ও সমাজ-উভয়ের জন্য বাঙালি হিসেবে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা বয়ে আনে।
ড. প্রদীপ রায়, সম্পাদক