চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তির দাবি সিপিজে’র। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ মে- সাংবাদিকদের কারাবন্দি করার ঘটনায় এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান এখন সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অধিকারবিষয়ক সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রিজন সেনসাস অনুযায়ী, সাংবাদিকদের কারাবন্দির ঘটনায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ১৪তম এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একাত্তর টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু-এর জামিন আবেদন হাইকোর্ট খারিজ করে দেওয়ার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। চাঁদাবাজির একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, ২০০৭ সালে বৈশাখী টিভির শেয়ারহোল্ডার হুমায়ুন কবিরকে অপহরণ করে জোরপূর্বক শেয়ার হস্তান্তর এবং সাড়ে চার কোটি টাকা আদায় করা হয়েছিল। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে বর্তমানে মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি হত্যা মামলা, যা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় দায়ের করা হয়।
মোজাম্মেল হক বাবু ছাড়াও বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ, ফারজানা রুপা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার সাংবাদিক শওকত মাহমুদ।
সিপিজের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে টানা পঞ্চম বছরের মতো ৩০০-এর বেশি সাংবাদিক কারাবন্দি ছিলেন। প্রতিবেদনে ভয়াবহ কারাগার পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলা হয়, অনেক সাংবাদিককে এমন পরিবেশে আটক রাখা হচ্ছে, যাকে মুক্তি পাওয়া এক ফিলিস্তিনি বন্দি “জীবিতদের কবরস্থান” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সাংবাদিক কারাবন্দির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চীন। দেশটিতে ৫০ জন সাংবাদিক কারাগারে রয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মিয়ানমার, সেখানে ৩০ জন সাংবাদিক কারাবন্দি। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইসরায়েল, যেখানে ২৯ জন সাংবাদিক কারাগারে আছেন।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের চার সাংবাদিককে দীর্ঘ সময় ধরে চার্জশিট ছাড়াই কারাগারে রাখা হয়েছে, যা কার্যত বিচারের আগেই শাস্তি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে। তিনি বলেন, “হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগে শত শত মানুষের সঙ্গে সাংবাদিকদেরও আসামি করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ অস্পষ্ট। এতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা এবং আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকতা পক্ষপাতদুষ্ট, বিতর্কিত বা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তা কখনোই ফৌজদারি অপরাধ নয়। গ্রহণযোগ্য সাংবাদিকতার সংজ্ঞা সরকার নির্ধারণ করতে পারে না।”
বাংলাদেশে সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ঘটনাকে দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন নাজমুল আহসান। তার ভাষ্য, দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব সাংবাদিকদের ওপরও পড়েছে। তিনি বলেন, “অনেক স্থানীয় সাংবাদিক সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সরকার পরিবর্তনের পর তারা শুধু সাংবাদিক নয়, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছেন।”
নাজমুল আহসান আরও বলেন, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের ওপর নির্ভরশীল কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়ে আসছে। সরকারি বিজ্ঞাপন, নিউজপ্রিন্টের শুল্ক, ওয়েজবোর্ড, লাইসেন্সিংসহ বিভিন্ন কারণে মালিকপক্ষকে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। তার মতে, অনেক টেলিভিশন চ্যানেল ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার “ঢাল” হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
সাংবাদিক সাহেদ আলম মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় দীর্ঘদিনের দমনমূলক প্রবণতার ফল হিসেবেই সাংবাদিক গ্রেপ্তারের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যৌক্তিক সমালোচনা যেন ব্যক্তি আক্রমণ, হামলা বা হত্যার হুমকিতে রূপ না নেয়।
সিপিজে মনে করছে, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর স্বচ্ছ ও দ্রুত পর্যালোচনা জরুরি। বিশেষ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার এবং চার্জশিট ছাড়া দীর্ঘদিন আটক থাকা সাংবাদিকদের মুক্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে সিপিজে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রীর কাছেও চিঠি পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছেন কুনাল মজুমদার। তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা আইনের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে বলেন, “সাংবাদিক হই বা মন্ত্রী হই, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নই। তবে সাংবাদিকদের পেশাগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে।”
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি মন্তব্য করেন, “যারা একটি মাফিয়া সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, তাদের অপরাধ গুরুতর। তবে যে ধরনের মামলা করা হয়েছে, তার মধ্যে সমস্যা রয়েছে।”
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা, দীর্ঘ কারাবাস এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগ ঘিরে এখন দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ বিরাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এভাবে সাংবাদিকদের দীর্ঘ সময় বিচারবহির্ভূত অনিশ্চয়তায় রেখে দিলে তা শুধু স্বাধীন সাংবাদিকতাকেই সংকুচিত করবে না, বরং দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।