অস্ট্রেলিয়া

 ইহুদি-খ্রিস্টান বিদ্বেষ প্রসারে আজহারির সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ

উগ্রবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায় নিরাপত্তা সংস্থার নজরে বুলবুলপুত্র মাহাদি ইসলাম

  • 2:14 pm - May 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১১৮২ বার
অস্ট্রেলিয়ায় নিরাপত্তা সংস্থার নজরে বুলবুলপুত্র মাহাদি ইসলাম। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১১ মে- অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামি উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার সন্দেহে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সদ্য সাবেক বিতর্কিত সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ছেলে মাহাদি ইসলামকে ঘিরে তদন্ত চালাচ্ছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিতর্কিত ইসলামিক বক্তা মিজানুর রহমান আজহারির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা এবং ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় নিয়ে বক্তব্য ও প্রচারণাকেও গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিডি ডাইজেস্ট পত্রিকা।

বিডি ডাইজেস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই আমিনুল ইসলাম বুলবুল জামায়াতে ইসলামির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। শুধু মতাদর্শগত ঘনিষ্ঠতাই নয়, দলটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক যোগাযোগের সঙ্গেও তিনি গোপনে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় তার বাসভবনে জামায়াতে ইসলামির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সভা ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো বলেও বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুলবুলকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি করার পেছনেও জামায়াতপন্থী একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিসিবির দায়িত্বে থাকাকালে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, ভারতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের মতো বিতর্কিত অবস্থান এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে স্থবিরতা তৈরি করায় তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন।

এদিকে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে তার ছেলে মাহাদি ইসলামকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়া সরকারের তদন্ত। বিডি ডাইজেস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাহাদি ইসলাম বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নিবিড় নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনের সন্দেহ, তিনি উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার, ধর্মীয় বিভাজনমূলক বক্তব্য এবং চরমপন্থী বৃত্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেন।

২০০৩ সালে জন্ম নেওয়া মাহাদি ইসলাম তার বাবার পেশাগত সূত্রে প্রথমে নাইজেরিয়ায় এবং পরে ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কৈশোর থেকেই ধর্মীয় আলোচনায় আগ্রহী হয়ে ওঠা মাহাদি ধীরে ধীরে ইসলামি মতাদর্শ প্রচারে সক্রিয় হন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রথমদিকে তিনি স্থানীয় বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে অংশ নিলেও খেলাধুলায় দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়তে পারেননি। পরে মেলবোর্নে একটি উচ্চ বেতনের চাকরিতে যোগ দেন। তবে সম্প্রতি সেই চাকরি থেকে তাকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং বাসা থেকেই তার ওপর নজরদারি ও তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।

মাহাদি ইসলাম উচ্চশিক্ষায় ‘স্ক্রিপচারাল অ্যান্ড টেক্সচুয়াল স্টাডিজ’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘হিব্রু বাইবেলের ব্যাখ্যা’ বিষয়ে একটি কোর্সও সম্পন্ন করেছেন। ধর্মীয় গ্রন্থ, বিশেষ করে বাইবেল ও ওল্ড টেস্টামেন্ট নিয়ে তার গবেষণামূলক আগ্রহ রয়েছে।

বিডি ডাইজেস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে মাহাদি ইসলাম বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থের ত্রুটি ও অসঙ্গতি তুলে ধরে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেন। বিশেষ করে তিনি দাবি করে থাকেন, কুরআন পূর্ববর্তী ধর্মীয় কাঠামোর অপূর্ণতা ও অসঙ্গতি সংশোধন করেছে। এই ধারণা প্রচারের অংশ হিসেবে তিনি মেলবোর্নের ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের তরুণদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন ক্লাস ও আলোচনায় অংশ নেন।

এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদে তিনি নিয়মিত বক্তব্য দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি ইসলামপূর্ব ধর্মীয় গ্রন্থের অসঙ্গতি, ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিন্নতা এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি নিয়মিত ভিডিও ও বক্তব্য প্রকাশ করতেন, যেখানে অন্যান্য ধর্মের সীমাবদ্ধতা এবং ইসলামকে বিকল্প ও চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদে তিনি নিয়মিত বক্তব্য দিয়েছেন। ছবিঃ সংগৃহীত

এসব কর্মকাণ্ডের সূত্র ধরে মাহাদি মেলবোর্নের বিভিন্ন ইসলামিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধর্মপ্রচার ও দাওয়াহ সম্পর্কিত কাজ করতে থাকেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংস্থা হলো Islamic Practice and Dawah Circle (IPDC), MATW-Project (Muslim Around the World Project)।

বিতর্ক আরও বাড়ে গত এপ্রিল মাসে। আইপিডিসি নামের একটি সংগঠন বিতর্কিত ইসলামিক বক্তা মিজানুর রহমান আজহারিকে অস্ট্রেলিয়ায় আমন্ত্রণ জানায়। “এ লিগ্যাসি অব ফেইথ” শিরোনামে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি, ক্যানবেরা, অ্যাডিলেইড ও পার্থ শহরে ইসলামিক সফরের আয়োজন করা হয়েছিল। বিডি ডাইজেস্ট দাবি করেছে, এই পুরো আয়োজনের সঙ্গে মাহাদি ইসলাম ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন।

মিজানুর রহমান আজহারি। ছবিঃ সংগৃহীত

তবে সফর শুরু হওয়ার আগেই অস্ট্রেলিয়া সরকার আজহারির ভিসা বাতিল করে এবং তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। অতীতে তার দেওয়া কিছু বক্তব্যকে উগ্রবাদী, ইহুদিবিদ্বেষী ও ঘৃণামূলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আজহারির বিরুদ্ধে অ্যাডলফ হিটলারের প্রশংসা, ইহুদিদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য এবং ঘৃণাপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এই ঘটনার পর থেকেই মাহাদি ইসলামের কর্মকাণ্ড অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সংস্থার বিশেষ নজরে আসে বলে দাবি করা হয়েছে। দেশটির সরকার বর্তমানে আইএস-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন মুসলিম নাগরিকদের ওপর কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যফেরত কিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিদেরও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

বিডি ডাইজেস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে মাহাদি ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় ভিডিও প্রকাশ, পোস্ট দেওয়া এবং ইসলামিক সেন্টারগুলোতে বক্তব্য দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। এর আগে তিনি প্রায় প্রতিদিনই ধর্মীয় কনটেন্ট প্রচার করতেন।

এদিকে ছেলের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তার ঘনিষ্ঠ এক পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুলবুল ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন পরিচিতজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শ চাইছেন। ওই সূত্রের ভাষ্য, মাহাদির কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড স্থানীয় প্রশাসনের কাছে স্পর্শকাতর ও সন্দেহজনক মনে হয়েছে। বিশেষ করে আজহারিকে অস্ট্রেলিয়ায় আনার উদ্যোগ এবং ধর্মীয় প্রচারণামূলক কার্যক্রম তার বিরুদ্ধে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মাহাদি ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ ঘোষণা করেনি। তদন্ত শেষে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। তবে উগ্রবাদে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে একবার তদন্তের আওতায় এলে দীর্ঘমেয়াদে নজরদারির মধ্যে থাকতে হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে এখনো আমিনুল ইসলাম বুলবুল বা মাহাদি ইসলামের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সূত্রঃ বিডি ডাইজেস্ট

এই শাখার আরও খবর

ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত নেতানিয়াহুর, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা

ইরানে আবারও হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তিনি ইরানের সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ…

যুদ্ধ এড়াতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিল পাকিস্তান ও কাতার

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুই দেশের কাছে…

বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন: বিদায়ের বেদনা, ঐতিহ্য, ধর্মীয় তাৎপর্য ও সম্প্রীতির মহামিলন

শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুলের দোলা, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস, ঢাকের মধুর বাদ্য আর চারদিকে উৎসবের আমেজ—এসবের মধ্য দিয়েই বাঙালির হৃদয়ে আবির্ভূত হয় শারদীয় দুর্গোৎসব।…

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম

‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম।’ সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়ে সুইটি আক্তারের…

ধামরাইয়ের ৫২০ কেজির অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা, হবে না বিসর্জন

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: ঢাকার ধামরাইয়ের বণিকবাড়িতে ৫২০ কেজি ওজনের অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমার পূজা চলছে। আগামীকাল বুধবার পূজা শেষে এটি দেওয়া হবে না বিসর্জন। এটিই এখানকার রীতি।…

শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন, আতঙ্কে বিদেশগামী যাত্রীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি স্টোর বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au