অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন তসলিমা নাসরিন।ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২ আগস্ট: দীর্ঘ ১৯ বছর পর আবারও কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। তবে এই প্রত্যাবর্তন আনন্দের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে দীর্ঘ নির্বাসন, হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা এবং নিজের ভাষার ভূখণ্ডে ফিরে আসার গভীর আকাঙ্ক্ষার এক আবেগঘন প্রকাশ। কলকাতার রবীন্দ্র সদনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি নিজের জীবনের দীর্ঘ নির্বাসন, স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার এবং ‘ঘর’ হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিন বলেন, নির্বাসিত মানুষের কাছে সময়ের হিসাব কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজার প্রতীক, প্রতিটি মাস অপেক্ষার আর প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর যন্ত্রণা বহন করে। তিনি বলেন, এতদিন পর কলকাতায় ফিরে তার মনে হচ্ছে তিনি শুধু একটি শহরে নয়, নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কাছেও ফিরে এসেছেন।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, আবার ইতিহাস এটাও মনে রাখবে কারা দরজা খুলেছিল।” পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা ও নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানান। তবে একই সঙ্গে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করতে হওয়াই সবচেয়ে বড় বেদনার বিষয়।
তসলিমা নাসরিন বলেন, তিনি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে কোনো লেখককে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে দেশ ছাড়তে হবে না কিংবা পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে জীবনযাপন করতে হবে না। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করা প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সংবর্ধনা গ্রহণের সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও নিজের স্বাধীন অবস্থান স্পষ্ট করেন এই লেখক। তিনি বলেন, “কৃতজ্ঞতা কখনো আনুগত্যের চুক্তি নয়। কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দিতে পারি না।” তার ভাষায়, কোনো ভালো কাজের প্রশংসা করতে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রয়োজন হয় না, আবার কোনো বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করতেও বিদ্বেষের দরকার নেই।
নিজের নির্বাসিত জীবনের ইতিহাস তুলে ধরে তসলিমা নাসরিন বলেন, ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট তাকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল। এরপর দেশে একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও তার জন্য আর ফেরার পথ খুলে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে কলকাতায় আশ্রয় পেলেও সেখান থেকেও তাকে চলে যেতে হয়েছিল।
অগাস্ট মাসের সঙ্গে নিজের জীবনের গভীর সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “অগাস্ট আমার জন্মের মাস, অগাস্ট আমার নির্বাসনের মাস, আর আজ থেকে অগাস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাসও।”
কলকাতার সঙ্গে তার আবেগঘন সম্পর্কের কথাও উঠে আসে বক্তব্যে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাংলা সাহিত্য, গান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে কলকাতাকে চিনেছেন। বাংলাদেশ ছাড়ার পর এই শহর তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু সেই আশ্রয়ও শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি।
নিজের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার সারাংশ তুলে ধরে তিনি বলেন, “এক বাংলায় আমার জন্ম, আরেক বাংলায় হারিয়ে যাওয়া ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন বাঙালি লেখকের জন্য দুই বাংলার কোথাও একটি ঘরও রইল না।” এই মন্তব্যে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, ইউরোপ তাকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেই আশ্রয় কখনোই তার কাছে নিজের ঘরের অনুভূতি এনে দিতে পারেনি। কারণ, মানুষের প্রকৃত ঘর কেবল একটি বাসস্থান নয়, বরং তার ভাষা, সংস্কৃতি ও আপনজনের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের প্রতীক।
বক্তৃতার শেষাংশে তসলিমা নাসরিন আবারও তার দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, কোনো ধর্ম কিংবা কোনো মতাদর্শই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তিনি সব ধরনের মৌলবাদের বিরোধী এবং বাংলাদেশ ও ভারতের উভয় দেশেই সংবিধান, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের ভিত্তিতে নাগরিক আইন প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেন।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে দেওয়া এই বক্তব্যে ব্যক্তিগত বেদনা, নির্বাসনের দীর্ঘ ইতিহাস, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন এবং হারিয়ে যাওয়া ‘ঘর’ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে উঠে এসেছে। আর সেই বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত ও আবেগঘন উচ্চারণ ছিল, “দুই বাংলার কোথাও আমার একটি ঘরও রইল না।”