বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটা, সংবিধান কী বলছে?

  • 1:33 pm - August 10, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৮০ বার
বঙ্গভবন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও বাসভবন। ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ১০ আগষ্ট: বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব, ক্ষমতার সীমা এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁর ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে সাধারণত রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সংবিধানে তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে এসব ক্ষমতার প্রয়োগ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর উপধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দুটি ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এর একটি হলো প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং অন্যটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। তবে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন রয়েছে এমন ব্যক্তিকেই সাধারণত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।

এর বাইরে রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণ করতে হয়। সংসদ আহ্বান, সংসদের অধিবেশন স্থগিত বা ভেঙে দেওয়া, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দেওয়া, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তি চুক্তি অনুমোদন এবং ক্ষমা প্রদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।

তবে সংবিধান রাষ্ট্রপতি পদকে বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা দিয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে সরাসরি আদালতে জবাবদিহির সুযোগ সীমিত। ফলে পদটির আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতা খুবই সীমিত। তাঁর মতে, সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বাইরে রাষ্ট্রপতির স্বাধীনভাবে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার কথা। তবে বাস্তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক থাকায় এই পদ কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা

স্বাভাবিক সময়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত থাকলেও রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটের সময় এই পদটির গুরুত্ব অনেক বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর একাধিক উদাহরণ রয়েছে।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সঙ্গে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের মধ্যে মতবিরোধকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরে সেনাপ্রধানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি কয়েকটি বিষয়ে সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্যে জড়িয়েছিলেন। তাঁর নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে সে সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।

২০০২ সালে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ঘটনাটি রাষ্ট্রপতি ও রাজনৈতিক দলের সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আনে।

২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক সংকটের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে তাঁকে ওই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।

রাষ্ট্রপতি পদ সবসময় এতটা সীমিত ছিল না

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সবসময় বর্তমানের মতো সীমিত ছিল না। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার শুরুতে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা ছিল। পরে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়।

১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি চতুর্থ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়। তখন নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই দেশ পরিচালিত হয়।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হয়। এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় এবং রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে।

কেন রাষ্ট্রপতি পদ এত গুরুত্বপূর্ণ?

সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরাসরি সরকার পরিচালনা না করলেও তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া, সাংবিধানিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংকটের সময় সংবিধানের নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটা কার্যকর হবে, তা শুধু সংবিধানের লিখিত বিধানের ওপর নির্ভর করে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফলে রাষ্ট্রপতি পদকে একদিকে যেমন সীমিত সাংবিধানিক ক্ষমতার একটি পদ বলা হয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিশেষ পরিস্থিতিতে এই পদটির গুরুত্বও অনেক বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি পদ ঘিরে বিভিন্ন সময়ের ঘটনাগুলোও সেই বিষয়টিই তুলে ধরে।

সুত্রঃ বিবিসি বাংলা

এই শাখার আরও খবর

লংমার্চ থেকে সরকার পতনের হুমকি, জামায়াত-এনসিপির লক্ষ্য কি?

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : সরকার গঠনের আট মাস না পেরোতেই রাজপথে সরব হয়ে উঠেছে বিরোধী দল। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং জ্বালানি ও…

পুলিশের সামনে বাসে ওঠার সময় নারীর মোবাইল ছিনতাই, চলন্ত বাস থেকে পড়ে গেলেন স্বামী

ঢাকার কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে পুলিশের উপস্থিতিতেই বাসে ওঠার সময় এক নারীর মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ছিনতাইকারীর ধাক্কায় চলন্ত বাস থেকে…

ছুটির পর ফ্রান্সে আবারও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু

দুই সপ্তাহের ছুটি শেষে ফ্রান্সে আবারও শুরু হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। তবে আগের কয়েক সপ্তাহের তুলনায় এবার আন্দোলনের ব্যাপ্তি অনেকটাই কম। সোমবার রাজধানী প্যারিস,…

মধ্যবর্তী নির্বাচন ভোট গণনায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রচারে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট শিবিরে উত্তেজনা বাড়ছে। বিশেষ করে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রকাশ্য…

মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ, কয়েক দশকের রীতি ভাঙল ট্রাম্পের বিচার বিভাগ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা, ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট এবং নির্বাচনের ফল অনুমোদন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে। দেশটির বিচার…

মাদ্রাসায় চাকরির এক মাস; দুই শিশুকে ধর্ষণ মামলায় হুজুর গ্রেপ্তার

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি আবাসিক হাফেজিয়া মাদ্রাসায় যোগ দেওয়ার এক মাসের মধ্যে ১০ ও ১১ বছর বয়সী দুই শিশুশিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au