মিয়ানমারের সাবেক রাষ্ট্রনেত্রী অং সান সু চি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১০ আগষ্ট- মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত প্রশাসন আটক সাবেক নেত্রী অং সান সু চির নিঃশর্ত মুক্তির জন্য আসিয়ানের নতুন করে জানানো দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার বিষয়ে আসিয়ানের বিশেষ দূত রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দেশটির সামরিক সরকার।
ফিলিপাইন বর্তমানে আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) এক প্রতিনিধির সঙ্গে সু চির সাক্ষাৎকে স্বাগত জানায় ফিলিপাইন। দেশটি এই সাক্ষাৎকে মিয়ানমারের সংকট নিরসনে সংলাপ ও সমঝোতার সম্ভাব্য একটি সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে রাজনৈতিক বন্দীদের এবং বিশেষ করে সু চির বিষয়ে আরও বেশি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁর ‘পূর্ণ ও নিঃশর্ত মুক্তির’ আহ্বান জানায়।
এর জবাবে শনিবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সু চির মুক্তির বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত দেশের প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নিতে হবে। সামরিক সরকার দাবি করেছে, মানবিক কারণ বিবেচনায় তাঁর সাজা ইতোমধ্যে কমানো হয়েছে। তবে তাঁকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি ‘আইন অনুযায়ী’ হতে হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
৮১ বছর বয়সী সু চিকে বর্তমানে রাজধানী নেপিডোর একটি গোপন স্থানে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। তাঁর সমর্থক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, সু চির বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
গত সপ্তাহে আইসিআরসির একজন প্রতিনিধির সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর আটক হওয়ার পর এটিই ছিল সু চির সঙ্গে কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার প্রতিনিধির প্রথম প্রকাশ্যে জানা সাক্ষাৎ।
মিয়ানমারের সামরিক সরকার জানিয়েছে, আসিয়ানের বর্তমান বিশেষ দূত ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া তেরেসা লাজারোর সঙ্গে তারা যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। তবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি সিঙ্গাপুর আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বিশেষ দূত ব্যবস্থার আর তেমন প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়ে মিয়ানমার প্রশ্ন তুলেছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এরপর দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘাত শুরু হয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার মুখে পড়ে সামরিক সরকার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসিয়ান পরবর্তী সময়ে পাঁচ দফা শান্তি উদ্যোগ গ্রহণ করে। এতে সহিংসতা বন্ধ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানে সহায়তার জন্য একজন বিশেষ দূত নিয়োগের কথা বলা হয়। তবে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ওই শান্তি উদ্যোগ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে আসিয়ানের পক্ষ থেকে একাধিকবার সমালোচনা করা হয়েছে।
এই কারণে সামরিক জান্তার প্রধান মিন অং হ্লাইংকে আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো থেকে দূরে রাখা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর সাবেক এই প্রধান ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তিনি আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের বৈধতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
তবে মিয়ানমারের বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন পক্ষ ওই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অভিযোগ, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ধরে রাখার পথ সুগম করতেই নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বেসামরিক শাসনে ফেরার একটি কৃত্রিম আবহ তৈরি করা হয়েছে।
ক্ষমতা গ্রহণের তিন মাসেরও বেশি সময় পর দেওয়া এক ভাষণেও মিন অং হ্লাইং আসিয়ানের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আসিয়ানের কিছু সদস্য রাষ্ট্র মিয়ানমারের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। একই সঙ্গে আসিয়ানের বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে তাঁর সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত নেবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সু চির মুক্তির বিষয়ে আসিয়ানের অবস্থান এবং মিয়ানমার জান্তার তা প্রত্যাখ্যানের ঘটনায় দেশটির রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আঞ্চলিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সু চির সঙ্গে আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রতিনিধির সাক্ষাৎকে সম্ভাব্য সংলাপের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে আসিয়ান, কিন্তু সামরিক সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই প্রক্রিয়া কতটা এগোতে দেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ