ঢাকেশ্বরী মন্দির। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ ফেব্রুয়ারি- ঢাকার ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তি ঘিরে আবারও আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দখলে থাকা ৫.৩১ বিঘা জমির দাবি থেকে সরে আসার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মহলে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংগঠনগুলোর মধ্যে তর্ক-বিতর্কও চলছে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ভাওয়াল রাজপরিবারের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নিত্যপূজা, বাৎসরিক উৎসব ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নির্বাহের জন্য ২০ বিঘা জমি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করেন। জমিটি ২১৬৮ নম্বর খতিয়ানভুক্ত মহালে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পরবর্তীতে ১৯০৮ সালে প্রতাপ চন্দ্র চক্রবর্তী ১৩৭৪ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়ের তিন পুত্রের কাছ থেকে একটি ভোগার্থ দলিল সম্পাদন করেন। ওই দলিলে উল্লেখ ছিল, সেবায়েত বা তাঁদের উত্তরাধিকারীরা জমি ভোগদখল করতে পারবেন, তবে কোনো অবস্থাতেই বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবেন না।
ব্রিটিশ আমলে পরিচালিত সিএস জরিপে (১৮৮৮–১৯৪০) ঢাকাস্থ মৌজায় সিএস ৩০ থেকে ৪৩ নম্বর দাগে পুরো সম্পত্তি দেবোত্তর হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয় এবং নকশায় পাকা পিলার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়। পাকিস্তান আমলে এসএ জরিপে (১৯৫৬–১৯৬২) লালবাগ মৌজায় ৯৪–৯৭ ও ১০১–১১৭ নম্বর দাগে জমির রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত হয়।

বেদখল ও আইনি জটিলতার অভিযোগ
দেশভাগ, ১৯৪৮ সালের ভূমি অধিগ্রহণ আইন, ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অস্থির সময়ে মন্দিরের বড় অংশের জমি বেদখল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, জালিয়াতি ও প্রশাসনিক যোগসাজশের মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে জমির মালিকানা বদলানো হয়।
এমনকি ১৯৫৩ সালে ‘মোমিন মোটর ওয়ার্কস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ২.৫৬ একর জমি লিজ দেওয়া হয়েছিল, যা দেবোত্তর সম্পত্তির আইনগত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অনেকে মনে করেন।
বর্তমানে অভিযোগ অনুযায়ী, মূল ২০ বিঘার মধ্যে প্রায় ১৩.৯ বিঘা জমি বেদখল রয়েছে। এর মধ্যে ৫.৩১ বিঘা রয়েছে বুয়েটের দখলে, আর বাকি ৮.৫৯ বিঘায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা রয়েছে।
৫.৩১ বিঘা জমি ছাড়ের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক
সম্প্রতি কিছু সংগঠন ভূমিমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে প্রস্তাব করেছে, বুয়েটের দখলে থাকা ৫.৩১ বিঘা জমির দাবি থেকে সরে এসে বাকি বেদখল জমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাদের যুক্তি, আংশিক সমঝোতার মাধ্যমে অন্তত অবশিষ্ট অংশ পুনরুদ্ধার সহজ হতে পারে।
তবে এ প্রস্তাবের বিরোধীরা বলছেন, দেবোত্তর সম্পত্তি আইনগতভাবে অ-হস্তান্তরযোগ্য। মামলার নথিতে পুরো ১৩.৯ বিঘা জমিকেই বেদখল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে কোনো অংশ দাবি থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা ভবিষ্যতে আইনি প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁদের মতে, মৌখিক সমঝোতার ইঙ্গিতও দলিলভিত্তিক দাবিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এ নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা ও বৃহত্তর জনমত গ্রহণের দাবি উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, জাতীয় মন্দিরের সম্পত্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত বা সীমিত পরিসরের আলোচনায় নয়, বরং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নেওয়া উচিত।
কিছু মহল বলছে, যদি বাস্তব পরিস্থিতিতে ৫.৩১ বিঘা জমি পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়, তাহলে আনুষ্ঠানিক লিখিত সমঝোতার মাধ্যমে প্রতীকী ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রস্তাব হিসেবে বুয়েট ক্যাম্পাসে ‘দেবী ঢাকেশ্বরী স্মৃতি মন্দির’ স্থাপন, হিন্দু ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাস নির্মাণ এবং প্রতি বছর বিজয়া দশমীতে মন্দিরে আনুষ্ঠানিক উপঢৌকন পাঠানোর বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
তবে এ ধরনের প্রস্তাব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বলে জানা গেছে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, দেবোত্তর সম্পত্তি সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমে চূড়ান্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে দানপত্র ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করলে বিভ্রান্তি কমবে এবং আলোচনাও বাস্তবভিত্তিক হবে।
জাতীয় মন্দিরের সম্পত্তি নিয়ে চলমান এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোন পথে যায়, তা এখন দেখার বিষয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান ও সরকারের ভূমিকার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ অগ্রগতি।
(তথ্যগত সহায়তা- শ্রী পরিমল চন্দ্র রায় রাণা, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,ঢাবি; সাঃ সম্পাদক, এসভিএস-বাংলাদেশ।)