অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ মে- অস্ট্রেলিয়ার আলবানিজ সরকার নতুন বাজেটে আবাসন খাতে বড় ধরনের কর সংস্কার চালুর পর তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ কর পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দুটি আলাদা জনমত জরিপে উঠে এসেছে।
সরকার গত সপ্তাহে ঘোষণা দেয়, সম্পদের ওপর মূলধনী মুনাফা করের ছাড় কমানো হবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রচলিত কর সুবিধা বা নেতিবাচক ঋণ সুবিধার ওপর সীমা আরোপ করা হবে। সরকারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া প্রজন্মগত বৈষম্য কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এই নীতিগুলো নিয়ে সমালোচকরা বলছেন, এগুলো সম্পত্তি মালিকানা ধনী ও বয়স্ক বিনিয়োগকারীদের হাতে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত করবে।
বাজেট ঘোষণার পর করা এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোটার মনে করেন নতুন বাজেট দেশের অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে ৬০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, আবাসন খাতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ভুল পথে নেওয়া সিদ্ধান্ত বা এতে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসবে না।
জরিপ অনুযায়ী, এই বাজেটের জনসমর্থন ছিল নেতিবাচক ২৫ শতাংশ, যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে অজনপ্রিয় বাজেট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলায়নি। লেবার সরকারের মূল ভোটের হার অপরিবর্তিত থেকে ৩১ শতাংশে স্থির রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এখনো ভোটারদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের নেতা হিসেবে আছেন, যদিও তার জনপ্রিয়তা নেগেটিভ ১৭ শতাংশে স্থিতিশীল।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলরের গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা বেড়ে নেগেটিভ ১২ শতাংশ হয়েছে। তবে কনজারভেটিভ জোটের ভোটার সমর্থন কমে ২০ শতাংশে নেমেছে। বিপরীতে কট্টর ডানপন্থী ওয়ান নেশন পার্টির ভোট ২৭ শতাংশে উঠেছে।
আরেকটি আলাদা জরিপে দেখা যায়, বাজেট ঘোষণার পর লেবার পার্টির মূল ভোট তিন শতাংশ কমে ২৯ শতাংশে নেমেছে। এই জরিপে ১৮০০ জন ভোটার অংশ নেন। সেখানে ওয়ান নেশন পার্টির সমর্থন দুই শতাংশ বেড়ে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, আর কনজারভেটিভ জোট পেয়েছে ২৩ শতাংশ।
এই জরিপে আরও দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী পছন্দের দৌড়ে অ্যাঙ্গাস টেইলর অ্যান্থনি আলবানিজকে অল্প ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছেন। সমর্থন হার ৩৩ শতাংশ বনাম ৩০ শতাংশ।
বাজেটের সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা এসেছে বয়স্ক ভোটার, সম্পত্তি বিনিয়োগকারী এবং সম্পত্তি মালিকদের কাছ থেকে। এই তিন শ্রেণির প্রায় ৪০ শতাংশই মনে করেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার কারণে সরকারের প্রতি তাদের আস্থা কমেছে। তবে তরুণ এবং ভাড়াটে নাগরিকদের মধ্যে এই বিরোধিতা তুলনামূলকভাবে কম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে সম্পত্তি বিনিয়োগ সংক্রান্ত কর সংস্কার অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। সরকার ২০২৫ সালের নির্বাচনী প্রচারে আবাসন কর না বদলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেই এবার দ্বিতীয় মেয়াদে বড় সংস্কার আনা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার অর্থমন্ত্রী জিম চালমার্স। ছবিঃ সংগৃহীত
অর্থমন্ত্রী জিম চালমার্স বলেন, বাজেটের এই সিদ্ধান্তের কারণে জনমত জরিপে চাপ আসবে তা তিনি আগেই ধারণা করেছিলেন। তিনি বলেন, কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয়তা বাড়বে এমন প্রত্যাশা সরকারের নেই। বরং এসব নীতি দীর্ঘমেয়াদে আবাসন বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য যারা এখনো বাড়ির মালিক হতে পারেননি।
নতুন নীতির আওতায় ৭.৩০ মিনিটের পর বাজেট ঘোষণার পর কেনা বিদ্যমান সম্পত্তিতে আগামী বছরের জুলাই পর্যন্তই নেতিবাচক ঋণ সুবিধা পাওয়া যাবে। এরপর থেকে এই সুবিধা শুধু নতুন নির্মিত বাড়ি বা বাজেট ঘোষণার আগে কেনা সম্পত্তির ক্ষেত্রে সীমিত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ বলেন, এই নীতির উদ্দেশ্য হলো প্রথমবার বাড়ি কেনা তরুণদের সুযোগ বাড়ানো। তার ভাষায়, যারা নিজের প্রথম বাড়ি কিনতে চায়, তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিনিয়োগকারীদের পাশে করদাতার সুবিধা থাকবে না।
সিডনি সহ বিভিন্ন শহরের নিলামে অংশ নেওয়া কিছু প্রথমবারের ক্রেতা জানান, তারা মনে করছেন বিনিয়োগকারীদের চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে বাজারে অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।
একজন ক্রেতা ম্যাট বেক বলেন, আগে অনেক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হতো, এখন সেটি কিছুটা কমতে পারে। আরেক ক্রেতা অ্যানি ইয়ার্ড জানান, বাজারে বিক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু উইলসন মনে করেন, বাজার এখন পরিবর্তনের পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তার মতে, বিনিয়োগকারী কমলে প্রথমবার বাড়ি কেনার সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে বিরোধীরা বলছে, এই সংস্কারের ফলে বিনিয়োগ কমবে এবং ভাড়ার খরচ বাড়বে। ছায়া অর্থমন্ত্রী টিম উইলসন বলেন, এতে বাড়ি নির্মাণ কমে যাবে এবং ভাড়াটেদের ওপর চাপ বাড়বে।
সরকারি অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই নীতির কারণে আগামী দুই বছরে বাড়ির দাম বৃদ্ধির গতি প্রায় দুই শতাংশ কমে যাবে এবং ভাড়া গড়ে সপ্তাহে প্রায় দুই ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার আবাসন বাজার এখন এক ধরনের রূপান্তর পর্যায়ে আছে। সরকার বলছে এটি প্রয়োজনীয় সংস্কার, আর বিরোধীরা বলছে এটি অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করবে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ ও নাইন নিউজ