শতদল তালুকদার, সিডনি , ১২ জুন: বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ, ধূমপান, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং পরিবেশগত নানা ঝুঁকির কারণে ফুসফুসের রোগ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি হওয়ায় ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে শুরু হয়েছে একটি যুগান্তকারী আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্প। প্রকল্পটির অন্যতম নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ড. সুভাষ চন্দ্র সাহা। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির স্কুল অব মেকানিক্যাল অ্যান্ড মেকাট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সিনিয়র লেকচারার হিসেবে কর্মরত।
ভারতের মর্যাদাপূর্ণ ‘স্কিম ফর প্রোমোশন অব অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ কোলাবোরেশন’ (স্পার্ক) কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত এই গবেষণা প্রকল্প এক কোটি রুপিরও বেশি অনুদান পেয়েছে। গবেষকদের আশা, প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব হবে।
ড. সাহা বলেন, “কৃত্রিম সিলিয়া প্রযুক্তি শুধু সিওপিডি বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের ফুসফুসের সংক্রমণ, জেনেটিক শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং গুরুতর শ্বাসনালীর সমস্যার ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগে শ্বাসনালীর স্বাভাবিক পরিষ্কারকরণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়, সেখানে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মিউকাস জমে থাকা, জীবাণু ও ধূলিকণা আটকে যাওয়া, বারবার সংক্রমণ এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে অসুবিধা অনেক দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুস রোগের সাধারণ সমস্যা। কৃত্রিম সিলিয়া যদি কার্যকরভাবে মিউকাস সরাতে পারে, তাহলে রোগীদের শ্বাসনালী পরিষ্কার রাখা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে এটি নতুন পথ খুলে দিতে পারে।”
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম সিলিয়া নিয়ে সীমিত পরিসরে গবেষণা হলেও মানব ফুসফুসে এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই এই প্রকল্প সরাসরি চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করবে। গবেষণার মাধ্যমে বোঝা যাবে, কৃত্রিম সিলিয়া কীভাবে মিউকাস পরিবহন করে, কোন ধরনের নকশা সবচেয়ে কার্যকর, এবং রোগগ্রস্ত অবস্থায় এর কার্যকারিতা কতটা বজায় থাকে। এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে উন্নত বায়োইনস্পায়ার্ড চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলে এই প্রকল্পকে অনেকেই ভবিষ্যতের চিকিৎসা প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। যদি গবেষণাটি সফল হয়, তবে এটি ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নতুন ধরনের সহায়ক চিকিৎসা প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগে প্রাকৃতিক সিলিয়ার কার্যকারিতা কমে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়, সেখানে কৃত্রিম সিলিয়া প্যাচ একদিন শ্বাসনালীর স্বাভাবিক পরিষ্কারকরণ প্রক্রিয়া আংশিকভাবে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। যদিও বাস্তব চিকিৎসা প্রয়োগের জন্য আরও দীর্ঘ গবেষণা, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন প্রয়োজন, তবুও এই উদ্যোগ ফুসফুস চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি উদ্ভাবনী ও আশাব্যঞ্জক দিক নির্দেশ করছে।
গবেষকেরা কী বলছেন?
ড. সুভাষ চন্দ্র সাহা বলেন, “ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা গেলে লক্ষ লক্ষ রোগীর জীবনমান উন্নত হতে পারে। আমরা এমন একটি সমাধান খুঁজছি, যা ভবিষ্যতে শ্বাসতন্ত্রের রোগের চিকিৎসায় নতুন পথ দেখাবে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান যুগে প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় ছাড়া বড় ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব নয়। এই প্রকল্প সেই সমন্বয়ের একটি বাস্তব উদাহরণ।”

ছবিঃ সংগৃহীত
মানবদেহের শ্বাসনালীর ভেতরে থাকা অতি সূক্ষ্ম চুলের মতো গঠনকে বলা হয় সিলিয়া। এগুলো সারাক্ষণ ছন্দময়ভাবে নড়াচড়া করে শ্বাসনালী থেকে ধূলিকণা, জীবাণু, দূষিত কণা এবং অতিরিক্ত মিউকাস বা কফ অপসারণে সাহায্য করে। একে ফুসফুসের প্রাকৃতিক পরিষ্কারক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের ধূমপান, বায়ুদূষণ, সংক্রমণ কিংবা বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে সিলিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্বাসনালীতে মিউকাস জমে যায়, শ্বাসকষ্ট বাড়ে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
এই সমস্যার সমাধানে গবেষকরা এমন একটি কৃত্রিম সিলিয়া প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা করছেন, যা ক্ষতিগ্রস্ত বা অকার্যকর সিলিয়ার বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। প্রযুক্তিটি সফল হলে ফুসফুসের স্বাভাবিক পরিষ্কার প্রক্রিয়াকে পুনরায় সক্রিয় করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষণা প্রকল্পে ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি রায়পুর, মতিলাল নেহরু ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি, কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রেসমেডের গবেষকেরা অংশ নিচ্ছেন। পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার পাশাপাশি উন্নত কম্পিউটার মডেলিং, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম সিলিয়ার নকশা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে।
একই সময়ে ড. সুভাষ চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির আরেকটি গবেষণায় শ্বাস-সহায়ক চিকিৎসা প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ‘কন্টিনিউয়াস হাই-ফ্রিকোয়েন্সি অসিলেশন থেরাপি’ (সিএইচএফও) শ্বাসনালীর সব অংশে সমানভাবে কাজ করে না। সিটি স্ক্যানের তথ্য ব্যবহার করে তৈরি ত্রিমাত্রিক শ্বাসনালী মডেলের মাধ্যমে গবেষকেরা বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে এই থেরাপির চাপ ও ঘর্ষণ শ্বাসনালীর বিভিন্ন অংশে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে গলা ও স্বরযন্ত্রের আশপাশের এলাকায় চাপ ও ঘর্ষণের মাত্রা বেশি থাকে। তবে থেরাপির চাপ বাড়ানো হলেও শ্বাসনালীর যেসব অংশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে, সেগুলোর অবস্থান পরিবর্তিত হয় না। অর্থাৎ মানুষের শারীরিক গঠনই নির্ধারণ করে দেয় কোথায় চিকিৎসার প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে।
ড. সুভাষ চন্দ্র সাহা বলেন, “ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা গেলে লক্ষ লক্ষ রোগীর জীবনমান উন্নত হতে পারে। আমরা এমন একটি সমাধান খুঁজছি, যা ভবিষ্যতে শ্বাসতন্ত্রের রোগের চিকিৎসায় নতুন পথ দেখাবে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান যুগে প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় ছাড়া বড় ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব নয়। এই প্রকল্প সেই সমন্বয়ের একটি বাস্তব উদাহরণ।”
গবেষকদের মতে, কৃত্রিম সিলিয়া প্রযুক্তি শুধু সিওপিডি রোগীদের জন্য নয়, বরং বিভিন্ন ফুসফুসের সংক্রমণ, জেনেটিক শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ব্রঙ্কিয়েকটাসিস, সিস্টিক ফাইব্রোসিস এবং গুরুতর শ্বাসনালীর সমস্যার ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগে শ্বাসনালীর স্বাভাবিক পরিষ্কারকরণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়, সেখানে এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
দুই বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে গবেষণার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গবেষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়, উন্নত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং যৌথ বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার পরিকল্পনাও রয়েছে। গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা সরঞ্জাম, থেরাপিউটিক ডিভাইস এবং উন্নত শ্বাসতন্ত্র সহায়ক প্রযুক্তি তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
কম্পিউটেশনাল বায়োফ্লুইড মেকানিক্স, শ্বাসতন্ত্রের প্রবাহ বিশ্লেষণ এবং তাপ সঞ্চালন গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত ড. সুভাষ চন্দ্র সাহা একাধিকবার বিশ্বের শীর্ষ দুই শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক প্রকল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বৈশ্বিক গবেষণায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের ক্রমবর্ধমান অবদানেরও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গবেষণাটি সফল হলে ভবিষ্যতে লক্ষ লক্ষ শ্বাসতন্ত্রের রোগীর জন্য নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দূষণ ও জীবনযাত্রাজনিত কারণে যখন ফুসফুসের রোগ বাড়ছে, তখন কৃত্রিম সিলিয়া প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করতে পারে। বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণের সমন্বয়ে পরিচালিত এই উদ্যোগ তাই ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে।