মেলবোর্ন, ১২ জুন- অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে নতুন ও কঠোর অভিবাসন নীতি কার্যকর করতে যাচ্ছে ইতালি। শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ‘রি-ইমিগ্রেশন ডিক্রি’কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন এই আইনের ফলে আশ্রয়প্রার্থী, ডাবলিন প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত ব্যক্তি, অবৈধ অভিবাসী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শরণার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইতালি সরকারের ভাষ্য, নতুন ডিক্রির প্রধান লক্ষ্য হলো অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা কমানো, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা এবং আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, কঠোর এই পদক্ষেপ আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার ও মানবিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ইতালিতে প্রবেশকারী অথবা বৈধ আইনি অবস্থান প্রমাণে ব্যর্থ ব্যক্তিদের বিশেষ ডিটেনশন সেন্টার বা সীমান্ত শিবিরে রাখা হতে পারে। এসব ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত আটক রাখার ক্ষমতা পাবে কর্তৃপক্ষ। এই সময়ের মধ্যে তাদের পরিচয় যাচাই, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ, আশ্রয় আবেদন মূল্যায়ন এবং আবেদন বাতিল হলে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে প্রবেশ করা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে নতুন আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
পরিবারসহ ইতালিতে প্রবেশকারী অভিবাসীদের জন্যও নতুন বিধান রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুসারে শিশুদের স্বার্থ বিবেচনায় পরিবারগুলোকে আলাদা পরিবারভিত্তিক কেন্দ্রে রাখা হতে পারে। তবে একা আসা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও কিশোরদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা বহাল থাকবে। একই সঙ্গে বয়স যাচাই ও নিরাপত্তা পরীক্ষার প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হতে পারে।
নতুন ডিক্রির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডাবলিন রেগুলেশন বাস্তবায়নে গতি আনা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো আশ্রয়প্রার্থী প্রথম যে দেশে প্রবেশ করে বা যেখানে প্রথম ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রদান করে, সাধারণত সেই দেশই তার আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
এখন থেকে কেউ যদি অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশ থেকে ইতালিতে প্রবেশ করে, কিন্তু তার প্রথম নিবন্ধন অন্য দেশে হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত তাকে সেই দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ‘তৃতীয় নিরাপদ দেশ’ নীতির গুরুত্বও বাড়ানো হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি যদি এমন একটি দেশ হয়ে ইতালিতে প্রবেশ করে, যেটিকে নিরাপদ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ইতালি তার আশ্রয় আবেদন গ্রহণ না করে ওই দেশেই ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করতে পারে।
এই নীতি বাস্তবায়নে উত্তর আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবং আলবেনিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করছে ইতালি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো নতুন আইনের সমালোচনা করে বলেছে, দীর্ঘ সময় আটক রাখা, দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং সীমান্তে কঠোর নজরদারি আশ্রয়প্রার্থীদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাদের মতে, যুদ্ধ, নির্যাতন, রাজনৈতিক সংকট কিংবা মানবিক বিপর্যয় থেকে পালিয়ে আসা মানুষের জন্য যথাযথ আইনি সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইতালির নতুন অভিবাসন ডিক্রি শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতিতেই নয়, বরং সমগ্র ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ইউরোপ যে ক্রমেই কঠোর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে, ইতালির এই পদক্ষেপ সেই প্রবণতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।