রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?
সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…
মেলবোর্ন, ১৯ আগষ্ট: এসএসসি পরীক্ষার আগে নেওয়া টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হলে কোনো শিক্ষার্থীকে মূল এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেওয়ার সুযোগ রয়েছে স্কুলের। তবে এই নিয়মকে ব্যবহার করে কোনো শিক্ষার্থীকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল করানো বা ভালো ফলের হার বাড়ানোর জন্য পরীক্ষার্থী বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা শিক্ষা বোর্ডের নজরদারির আওতায় আসতে পারে।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসকে ঘিরে এমনই একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জন শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। তবে স্কুলটির দশম শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৪৮৫ জন। তাদের মধ্যে ১০৩ জন টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ায় এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি।
এই ফলাফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, শতভাগ জিপিএ-৫ নিশ্চিত করতে টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নজরে আসার পর ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গত ১৬ আগস্ট স্কুল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে।
বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ড. মো. মাসুদ রানা খান স্বাক্ষরিত নোটিশে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থী, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী, নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করা শিক্ষার্থীদের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে এসব তথ্যের মাধ্যমে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০১২ সাল থেকে টানা ১৫ বছর প্রতিষ্ঠানটির এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার শতভাগ।
এর মধ্যে ২০১৫, ২০১৭, ২০২২ ও ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। চলতি বছরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে এখান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৫৩ জন ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে। বিভিন্ন বছর প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এবারের ফলাফলে ৪৮৫ জনের মধ্যে ১০৩ জনকে পরীক্ষার বাইরে রেখে বাকি ৩৮২ জনের সবাই জিপিএ-৫ পাওয়ার পরই প্রশ্ন উঠেছে, টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন আহমেদ জানিয়েছেন, ৪৮৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৩ জন টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের এসএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়নি। বাকি ৩৮২ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে।
স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, এ বিষয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং তাদের কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম নেই। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নোটিশের জবাব নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রমাণসহ দেওয়া হবে।
স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেনও জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ ব্যাখ্যা ও প্রমাণ বোর্ডের কাছে দেওয়া হবে।
তবে কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষায় এমনভাবে মূল্যায়ন করা হয়, যাতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ফল করতে পারে এমন শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয়।
এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী দাবি করেন, তিনি টেস্ট পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে মাত্র দুই নম্বরের জন্য অনুত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পরে অন্য স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে তিনি এবং তার কয়েকজন সহপাঠী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
আরেক শিক্ষার্থী জানান, স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় উচ্চতর গণিতে ফেল করার কারণে তিনি সেখান থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় ভালো ফল করে অন্য একটি স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পান।
তাদের অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষার ফলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে এসএসসি পরীক্ষার বাইরে রাখা হতো। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত ও স্কুল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওই শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে যে জেলা প্রশাসকের কথা এসেছে, তিনি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কমিশন সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তৎকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, স্কুলের বক্তব্য ছিল শিক্ষার্থীরা টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছে। বিষয়টি যাচাই করতে কিছু শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন উত্তীর্ণও হয়েছিল।
মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বলেন, পরীক্ষায় কে জিপিএ-৫ পেল, সেটি বড় বিষয় নয়। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো এমনভাবে পাঠদান করা, যাতে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো করতে পারে এবং কেউ অকৃতকার্য না হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী, এসএসসি পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষা নেওয়া হয়। বৈধ রেজিস্ট্রেশনধারী এবং নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই এসএসসি পরীক্ষার আবেদন ফরম পূরণ করতে পারে।
অর্থাৎ, নিয়ম অনুযায়ী টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে না দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এই নিয়মের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি যাচাই করা, কোনো প্রতিষ্ঠানের জিপিএ-৫ বা শতভাগ পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়ানো নয়।
২০১৮ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক বিশেষ আদেশেও এসএসসি ও এইচএসসি নির্বাচনী পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মূল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে নির্বাচনী পরীক্ষার উত্তরপত্র ফল প্রকাশের পর অন্তত ছয় মাস সংরক্ষণ করার নির্দেশও দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী জানান, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া প্রয়োজন। তবে কোনো শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলে প্রতিষ্ঠান চাইলে তাকে পুনরায় বা রিটেক পরীক্ষার সুযোগ দিতে পারে।
তিনি বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান জিপিএ-৫ পাওয়ার সম্ভাবনা কম এমন শিক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ দেখিয়ে ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়ার চেষ্টা করে। এ ধরনের প্রবণতাকে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য শুধু নিজেদের ফলাফল ভালো দেখানো হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে পড়ানো এবং তাদের ভালো ফল করার উপযোগী করে গড়ে তোলাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব।
ফলে টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলেই যে একজন শিক্ষার্থী কোনোভাবেই এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না, বিষয়টি এতটা সরল নয়। নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ফরম পূরণের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলেও কোনো শিক্ষার্থীকে ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়েছে কি না, তা নিয়ে অভিযোগ উঠলে শিক্ষা বোর্ড প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের ক্ষেত্রে এখন সেই যাচাই প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ। ৪৮৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৩ জন টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ এবং তাদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেওয়া, আর বাকি ৩৮২ জনের সবাই জিপিএ-৫ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর স্কুল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও শিক্ষা বোর্ডের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au