তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ—তিন দেশের ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে’ বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে উঠেছে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা প্রশ্ন। ছবি: ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন, ২৬ আগস্ট: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা ‘মক্কা প্যাক্টে’ বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে বাংলাদেশ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে।
৮ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। সৌদি আরবের সামনে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, হুতি হামলা এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট রয়েছে। তুরস্কের নিরাপত্তাস্বার্থ সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া ও ককেশাস অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। অন্যদিকে পাকিস্তানকে সীমান্ত উত্তেজনা ও অভ্যন্তরীণ জঙ্গি সহিংসতার মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিন দেশের জন্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে তাদের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার বাংলাদেশের নিরাপত্তা প্রয়োজনের সঙ্গে এক নয় বলে মনে করেন আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া।
এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্কে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে তিনি বলেন, কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার আগে ঢাকাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এর কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিণতি বিবেচনা করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের নয়
কল্লোল কিবরিয়ার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কাঠামো আমদানি করা উচিত নয়। বর্তমানে যে দেশ বাংলাদেশের বন্ধু, ভবিষ্যতে সামরিক জোটের কোনো সদস্যের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলে সেই সম্পর্ক অযথা উত্তেজনার মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের কোনো ভূখণ্ডগত বিরোধ বা সামরিক সংঘাত নেই। ভবিষ্যতে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কোনো সংঘাত শুরু হলে মক্কা প্যাক্টের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশকে একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। এতে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংকটকে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। সামরিক অংশীদারদের ভূরাজনৈতিক হিসাবের কারণে দেশের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা সীমিত হওয়া উচিত নয়।
‘এক সদস্যের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ’
মক্কা প্যাক্টের যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। এ ব্যবস্থাকে ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
এমন শর্তের কারণে জোটের কোনো একটি দেশের সংঘাত বাংলাদেশেরও নিরাপত্তা সমস্যা হয়ে উঠতে পারে—এমনকি সেই বিরোধের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও।
কল্লোল কিবরিয়া বলেন, “কোনো চুক্তির কারণে অন্য একটি দেশের শত্রু স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের শত্রুতে পরিণত হওয়া কিংবা বাংলাদেশের পছন্দ নয়—এমন যুদ্ধে দেশের সেনাদের পাঠানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়া উচিত নয়।”
অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ইতিমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যব্যবস্থার জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম, জাহাজ চলাচলের ব্যয় এবং বিমার খরচ বাড়তে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়বে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী এবং রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগের বড় উৎস। এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর লাখো পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল।
এ কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রবাসী কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংবিধান ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাকে পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এই নীতিগুলো পারস্পরিক বিরোধে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ বাংলাদেশকে দিয়েছে। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই কূটনৈতিক স্বাধীনতা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
ভারত ও মিয়ানমারের মাঝখানে এবং বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও জটিল। আন্তর্জাতিক বাজার, সমুদ্রপথ, আমদানি করা জ্বালানি, প্রবাসী কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের ওপর দেশটি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই অন্য কোনো দেশের নিরাপত্তাগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পুরো বিশ্বকে দেখার সুযোগ বাংলাদেশের নেই।
শান্তিরক্ষা মিশন ও সামরিক জোট এক নয়
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের ভূমিকার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে শক্তিশালী মর্যাদা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের সেনা ও পুলিশ সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন।
তবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ও যৌথ সামরিক জোটের সদস্যপদ এক নয়। শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও আইনি কাঠামোর অধীনে কাজ করেন। বিপরীতে, যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে এক সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদেরও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উচিত বৈশ্বিক শান্তিতে অবদান রাখার বর্তমান ভূমিকা বজায় রাখা; দেশের প্রত্যক্ষ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কহীন সংঘাতে সেনাদের যুক্ত করার অঙ্গীকার করা নয়।
‘পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে বাংলাদেশকে’
বিশ্ব ক্রমেই বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়লেও সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সামর্থ্য এখনো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এই স্বাধীনতা দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও প্রবাসী কর্মসংস্থান রক্ষায় ঢাকাকে তুলনামূলক বেশি সুযোগ দেয়।
কল্লোল কিবরিয়ার মতে, বাংলাদেশকে প্রতিটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তার নিজস্ব গুরুত্বের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। সবার সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অন্য রাষ্ট্রের বিরোধে পক্ষ নেওয়ার চাপ প্রতিরোধ করতে হবে।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে বাংলাদেশকেই—অন্য দেশের সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীন বিবেচনা এবং নিজস্ব নিরাপত্তা প্রয়োজনই হওয়া উচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান ভিত্তি।