সেনার পোশাকে বাড়িতে ঢুকে চা খেয়ে ২৩ কাশ্মীরি পণ্ডিতকে হত্যা, ২৮ বছর পর ফের তদন্ত। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ আগষ্ট- জম্মু-কাশ্মীরে প্রায় তিন দশক আগে সংঘটিত ভয়াবহ ওয়ান্ধামা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নতুন করে শুরু করেছে স্টেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এসআইএ)। ১৯৯৮ সালের ওই হত্যাকাণ্ডে সশস্ত্র জঙ্গিদের হাতে একই এলাকার ২৩ জন কাশ্মীরি পণ্ডিত নিহত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকা মামলাটি নতুন করে খতিয়ে দেখে হামলায় জড়িত জঙ্গি, সহযোগী ও স্থানীয় সহায়তাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
১৯৯৮ সালের ২৫ জানুয়ারি রাতে গান্দেরবল জেলার ওয়ান্ধামা গ্রামে ঘটে ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের আগের রাতে সশস্ত্র জঙ্গিরা সেনাবাহিনীর পোশাক পরে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বাড়িতে প্রবেশ করে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
জঙ্গিরা প্রথমে বাড়ির দরজায় কড়া নেড়ে নিজেদের সেনাসদস্য হিসেবে পরিচয় দেয় এবং চা খেতে চায়। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়নি। বাড়ির ভেতরে প্রবেশের পর তারা পরিস্থিতি বুঝে নেয়। এরপর পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সদস্যদের বাইরে বের করে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। পরে গুলি চালিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়।
হামলায় মোট ২৩ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুও ছিলেন। হত্যাকাণ্ডটি সে সময় পুরো কাশ্মীর উপত্যকায় ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করে এবং কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী কিশোর
ওই হত্যাকাণ্ডে ১৪ বছর বয়সী বিনোদ কুমার ধর প্রাণে বেঁচে যান। তিনি একটি স্থানে লুকিয়ে থাকায় জঙ্গিদের চোখ এড়িয়ে যান। পরবর্তী সময়ে তাঁর দেওয়া তথ্য তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তাঁর বক্তব্য মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল।
তবে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। ফলে মামলাটি দীর্ঘদিন অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে ছিল।
এবার পুরোনো নথি ও আলামত নতুন করে পর্যালোচনা করার পাশাপাশি হামলায় জড়িত সন্দেহভাজনদের বর্তমান অবস্থান এবং তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে এসআইএ।
একাধিক জায়গায় তল্লাশি
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ওয়ান্ধামা হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি কাশ্মীরি পণ্ডিত নেতা টিকা লাল টাপলু হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত মামলাতেও সম্প্রতি উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালিয়েছে এসআইএ।
পুরোনো নথি, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং সন্দেহভাজনদের বিষয়ে নতুন করে পাওয়া সূত্রগুলো মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা বিশেষ করে হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত জঙ্গি, তাঁদের সহযোগী এবং স্থানীয়ভাবে সহায়তাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
শুধু ওয়ান্ধামা হত্যাকাণ্ড নয়, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ওপর সংঘটিত আরও কয়েকটি পুরোনো হত্যাকাণ্ডের তদন্তও নতুন করে জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নার্স সরলা ভাট, লেখক সর্বানন্দ কৌল প্রেমী ও তাঁর ছেলে বীরেন্দ্র কৌল, বিজেপি নেতা টিকা লাল টাপলু এবং বিচারপতি নীলকান্ত গাঞ্জু হত্যার মামলা।
সরলা ভাট হত্যা মামলায় চার্জশিট
পুরোনো মামলাগুলোতে নতুন করে তদন্তের গতি বাড়ার পেছনে সাম্প্রতিক কিছু অগ্রগতিও ভূমিকা রাখছে। চলতি বছরের জুনে ১৯৯০ সালে কাশ্মীরি পণ্ডিত নার্স সরলা ভাট হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৭৩৭ পাতার চার্জশিট জমা দিয়েছে এসআইএ।
চার্জশিটে তৎকালীন জম্মু-কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টের (জেকেএলএফ) প্রধান ইয়াসিন মালিককে হত্যার মূল ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া আগস্টে সর্বানন্দ কৌল প্রেমী ও তাঁর ছেলে বীরেন্দ্র কৌল হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও জম্মু-কাশ্মীরের নয়টি স্থানে তল্লাশি চালানো হয়েছে।
কেন ২৮ বছর পর ফের তদন্ত?
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পুরোনো এসব মামলায় নতুন কিছু তথ্য ও সূত্র পাওয়া গেছে। কয়েকটি ঘটনায় হামলায় জড়িত জঙ্গি, তাঁদের সহযোগী এবং তথাকথিত ‘ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কারদের’ পরিচয় সম্পর্কেও নতুন তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তকারীদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টদের কেউ ইতোমধ্যে মারা গেছেন, আবার কেউ এখনও জীবিত এবং আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে পুরোনো নথি ও নতুন তথ্য একত্র করে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্ত এগিয়ে নিতে চাইছে এসআইএ।
বিচারপতি নীলকান্ত গাঞ্জু হত্যাকাণ্ডের তদন্তও নতুন করে শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের উপত্যকায় ফেরানোর উদ্যোগের মধ্যেই কয়েক দশক আগের এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নতুন করে জোরদার করাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের লক্ষ্য শুধু পুরোনো মামলার নথি পুনরায় খতিয়ে দেখা নয়, বরং হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক, পরিকল্পনাকারী এবং সহযোগীদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
সূত্রঃ আনন্দবাজার