বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ ফেব্রুয়ারি- দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর দলটি আবারও ক্ষমতায় ফিরেছে। একই সঙ্গে ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম কোনো পুরুষ প্রধানমন্ত্রী দেশের নেতৃত্বে এলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর এটি ছিল প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দুই বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অন্তর্বর্তী প্রশাসন ও নানা অনিশ্চয়তার পর ভোটের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন হলো।
দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে অবস্থানের পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তারেক রহমান দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় তাঁর মা ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। এমন আবেগঘন প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন নতুন মাত্রা যোগ করে।
নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয় পায়। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম একে রাজনৈতিক ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
নতুন সরকারের শুরুতেই দেখা যায় কিছু ভিন্নতা। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনে শপথ না নিয়ে সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। নতুন মন্ত্রিসভা দেশের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা নির্ধারণে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনসভায় তারেক রহমান বলেন, তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান, যা দেশের মানুষের স্বপ্নের প্রতিফলন হবে। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ইস্যুতেও তিনি সুস্পষ্ট অবস্থান নেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন। তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্র সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে কাজ করবে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতির কথা ঘোষণা করেছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণই হবে পররাষ্ট্রনীতির মূল নির্ধারক। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
এ ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিএনপি। গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার এ সনদের পক্ষে মত দিয়েছিলেন বলে দলটির দাবি। নতুন সরকার সেই সনদের আলোকে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছে।
দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার পর বিএনপির এই প্রত্যাবর্তনকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে নতুন সরকার তাদের ঘোষিত অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়ন করতে পারে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কতটা সফল হয়।
সূত্রঃ হিন্দুস্তান টাইমস