খুলনায় দুর্বৃত্তের গুলিতে সাবেক ছাত্রদল নেতা নিহত
মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- খুলনা মহানগরীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে রাশিকুল আনাম রাশু (৩৬) নামে এক সাবেক ছাত্রদল নেতা নিহত হয়েছেন। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দৌলতপুর…
মেলবোর্ন, ১৬ মার্চ- ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে যখন বাংলাদেশের জ্বালানি খাত অস্থির, সঙ্কট সামলাতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে- ঠিক সেই সময়ে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে একটি গোষ্ঠী। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা আসার পথে কমপক্ষে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল গাড়িসহ গায়েব হয়ে গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, তেল চুরির একটি পুরনো সিন্ডিকেট শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে অবস্থিত পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর জন্য আনা ওই জেট ফুয়েল অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে।
পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি গাড়ি সাধারণত ১৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল বহন করে থাকে। সেই হিসাবে ওই চারটি গাড়িতে কমপক্ষে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল ছিল।
যেভাবে ঘটনা ঘটে
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে জেট ফুয়েল নিয়ে চারটি গাড়ি কুর্মিটোলার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। কিন্তু সেই গাড়িগুলো কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছায়নি। তবে ‘চোর-চক্র’ সুকৌশলে কাগজে-কলমে দেখিয়েছে, গাড়িগুলো কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, ডিপোতে নয় সেই জেট ফুয়েল বাইরে পাচার করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা অয়েলের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, গাড়িগুলো গোদনাইল ডিপো থেকে ঠিকই ছেড়েছিল, কিন্তু কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছায়নি। বিষয়টি জানাজানির পর অনেকেই অস্বস্তিতে রয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেই চুরির বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারবে।
প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত
ডিপোতে যাওয়ার পথে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল চুরির অভিযোগ প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে পদ্মা অয়েল পিএলসির তদন্ত কমিটি। কমিটি দুদিন ধরে তদন্ত করে দেখেছে ওই চারটি গাড়ি ডিপোতে প্রবেশ করেনি। এছাড়া ডিপোর রিজার্ভও কম পাওয়া গেছে।

মো. সাইদুল হককে বদলির অফিস আদেশ
প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে মো. সাইদুল হককে বদলি করা হয়েছে। ১৫ মার্চ পদ্মা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ ও প্রশাসন) মীর মো. ফখর উদ্দিনের সই করা একটি অফিস আদেশে তাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থার্ড টার্মিনাল প্রজেক্টের ইনচার্জ হিসেবে বদলি করা হয়েছে। একই আদেশে তার জায়গায় দৌলতপুর ডিপোকে ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা মো. রিদওয়ানুর রহমানকে পদায়ন করা হয়।
বিমানের তেল গাড়ি-মোটর সাইকেলে
জেট ফুয়েল বা এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল (এটিএফ) হলো উচ্চমানের পরিশোধিত কেরোসিনভিত্তিক জ্বালানি। যা মূলত বাণিজ্যিক ও সামরিক বিমান, হেলিকপ্টার এবং টারবাইন ইঞ্জিন চালিত উড়োজাহাজে ব্যবহৃত হয়। দাম কম হওয়ায় বিশেষ একটি চক্র বেশি দামের অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করে।
গত মার্চ মাসের শুরুতে নির্ধারণ করা দাম অনুযায়ী বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ রুটের জন্য লিটার প্রতি জেট ফুয়েলের ১৭ টাকা ২৯ পয়সা বাড়িয়ে ১১২ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। আগে দাম ছিল ৯৫ টাকা ১২ পয়সা। আর আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করা হয় ০.৭৩৮৪ ডলার।
আর প্রতি লিটার অকটেনের বর্তমান দাম ১২০ টাকা। কিন্তু চোরাই হিসেবে আরও কম দামে জেট ফুয়েল কিনে তা অকটেনের সাথে মিশিয়ে ১২০ টাকা লিটার বিক্রি করে। অকটেনের নামে বিক্রি হওয়া এই জেট ফুয়েল ব্যক্তিগত গাড়ি এবং মোটর সাইকেলে ব্যবহার করে প্রতারিত হন গ্রাহক।
চোরের পুরনো সিন্ডিকেট
পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক (এভিয়েশন) মো. সাইদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিই এই তেল চুরির সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেন। তার চাকরিজীবনের বেশিরভাগ সময় এই ডিপোতে কর্মরত আছেন। নানা অনিয়মের জন্য গত বছরের ২০ জানুয়ারি তাকে সতর্ক করে চিঠি দেয় পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ।
কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (পরিচালন ও পরিকল্পনা) মো. আসিফ মালেকের স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয়, ‘আপনার ডিপোর সার্বিক পরিচালন প্রক্রিয়া এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা কোম্পানির ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। ইতোপূর্বে এ বিষয়ে অবহিত করা হলেও প্রত্যাশিত সংশোধন লক্ষ্য করা যায়নি।
অতএব, সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠানের সকল নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগ পুনরায় পরিলক্ষিত হলে প্রতিষ্ঠানের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
দমে যাননি সাইদুল হক
এমন সতর্কবার্তার পরেও ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হক দমে যাননি। সর্বশেষ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলা ডিপো থেকে ধারাবাহিকভাবে চুরির অভিযোগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটিতে বিপিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনকে আহ্বায়ক, বিপিসির ব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. বদরুল ইসলাম ফকিরকে সদস্য এবং পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তা (ইঞ্জি.) কে এম আবদুর রহিমকে সদস্য সচিব করা হয়।
বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতান কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলে ছিলেন। কিন্তু কমিটি যথাসময়ে প্রতিবেদন দিতে পারেনি। তবে তদন্তের অংশ হিসেবে গত ৮ মার্চ কমিটি পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা ডিপো পরিদর্শন করে তেল চুরিতে জড়িত অভিযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।
অভিযোগ অস্বীকার
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. সাইদুল হক। তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে একটি মহল।
চুরির ঘটনা ধামাচাপার চেষ্টা
চুরির ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সাইদুল হকের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট ভিন্নভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এমনকি বিক্রির সময় কিছু কম দেওয়া তেল দিয়ে চুরি হওয়া জেট ফুয়েলের হিসাব মেলানোর চেষ্টা হচ্ছে।
সাইদুল হকের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ
সনদ ও স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং আয় বর্হিভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আগে থেকেই সাইদুল হকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিল। এত এত অভিযোগের পরও তাকে গুরুত্বপূর্ণ এই ডিপোর দায়িত্বে রাখা হয়।
২০১৯ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে থাকাকালীন তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় জাল বেতন সনদ জমা দেন বলে অভিযোগ উঠে। সেই সনদে তৎকালীন উপ-মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) মোহাম্মদ শহীদুল আলমের স্বাক্ষর জাল করা হয়। এছাড়াও সংযুক্ত চারটি ভাউচারে কোম্পানির সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক আখতার উদ্দৌজা এবং সাবেক মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মহিউদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরও জাল করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।
শাস্তির বদলে পদোন্নতি
সাইদুল হকের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠে তা তদন্তে বিপিসি একটি কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু যথাসময়ে ওই কমিটি প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। এমনকি ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর কর্তৃপক্ষ সাইদুল হককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেও তা নিষ্পত্তি করা হয়নি। এর আগে চাঁদপুর ডিপোর ইনচার্জ থাকাকালীন তেলে ভেজাল মেশানো এবং ডিলারদের কম তেল দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। এত কিছুর পরও কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা ছাড়াই ২০২০ সালে তাকে উপ-ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au