মেলবোর্ন, ১৯ মার্চ- ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর এক অমূল্য সুযোগ। এই আনন্দকে ভাগ করে নিতে প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটছেন লাখো মানুষ। কিন্তু সেই ঘরে ফেরার পথটি যেন আনন্দের নয়, বরং ভোগান্তি, ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তায় ভরা এক দীর্ঘ যাত্রা। সড়ক, রেল ও নৌপথ—সবখানেই একই চিত্র। অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, যানবাহনের সংকট, অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা এবং প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মিলিয়ে এবারের ঈদযাত্রাও হয়ে উঠেছে কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
রাজধানী ছাড়ার শুরুতেই মানুষের ঢল নেমেছে মহাসড়কে। ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দেখা গেছে দীর্ঘ যানজট ও ধীরগতি। বিশেষ করে যমুনা সেতু থেকে করটিয়া বাইপাস পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানবাহন প্রায় থেমে থেমে চলেছে। কোথাও কোথাও কয়েক কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
ট্রাক-পিকআপে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা
পরিবহন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে খোলা ট্রাক ও পিকআপে করে বাড়ি ফিরছেন। নারী, শিশু, বৃদ্ধ—কেউ বাদ নেই এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে। নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই, নেই সিট বা ছাউনি। তবুও প্রিয়জনের টানে সব কষ্ট উপেক্ষা করে রওনা হচ্ছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ থেকে টাঙ্গাইলে যাওয়া এক যাত্রী জানান, তার যাত্রাপথে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। চন্দ্রা এলাকায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়েছে। অন্য এক নারী যাত্রী বলেন, বছরের এই দুটি ঈদেই বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পান। কষ্ট হলেও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার আনন্দই বড়।

ট্রাক-পিকআপে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা। ছবিঃ সংগৃহীত
ট্রাকের যাত্রী আসিফ বলেন, আমি নারায়ণগঞ্জ থেকে টাঙ্গাইলে আসলাম ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছে। চন্দ্রা এলাকায় যানজটে আটকে ছিলাম। মহাসড়কে যানবাহনের ধীরগতি আছে। গাড়িগুলো স্বাভাবিক গতিতে চলছে না। দ্বিগুণ ভাড়া বেশি দিয়ে আসলাম।
ট্রাকের আরেক যাত্রী তানিশা বলেন, বছরে দুই ঈদে বাড়িতে যেতে পারি। ট্রাকে যেতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট হলেও পরিবারের সাথে ঈদ করব এটাই শান্তি। অনেকেই আমার মতো ট্রাকে করে যাচ্ছে। ট্রাকে এসেছি ভাড়া বেশি দিয়ে।
যানজটের কারণ: বৃষ্টি, বিকল গাড়ি ও অব্যবস্থাপনা
এই ভোগান্তির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়াই প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টানা বৃষ্টিপাত। বুধবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি রাতভর চলায় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যায়, ফলে যানবাহনের গতি কমে যায়।

অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, মহাসড়কে যানবাহন বিকল হওয়ায় যানবাহনের ধীর গতির সৃষ্টি হয়েছিল। ছবিঃ সংগৃহীত
এছাড়া যমুনা সেতু সংযোগ সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে গাড়ি বিকল হয়ে পড়ায় যানজট আরও তীব্র হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিকল গাড়ি দ্রুত সরানো না হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক আটকে থাকে। যাত্রী ওঠানামার জন্য যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানোও যানজট বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মুহাম্মদ শরীফ বলেন, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, মহাসড়কে যানবাহন বিকল হওয়ায় যানবাহনের ধীর গতির সৃষ্টি হয়েছিল। যমুনা সেতু থেকে পৌলি পর্যন্ত যানবাহনের ধীরগতি রয়েছে। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মহাসড়কে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। যানজট যাতে না হয়, সেই জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
চন্দ্রা মোড়: দুর্ভোগের আরেক নাম
গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকাটি প্রতি বছরই ঈদযাত্রায় অন্যতম ভোগান্তির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কোনাবাড়ী থেকে মির্জাপুর পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। যাত্রীরা জানান, রাতভর গাড়িতে বসে থেকেও খুব সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতে পেরেছেন তারা।
অনেক যাত্রী বাস থেকে নেমে হেঁটে কিছু পথ পাড়ি দিয়ে আবার অন্য যানবাহনে উঠেছেন। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এই যাত্রা হয়ে উঠেছে আরও কষ্টকর।
রাজশাহীগামী যাত্রী মালেক বলেন, কোনাবাড়ী থেকে রাত ১২টার দিকে বাসে উঠেছেন। ভোর চারটায় চন্দ্রা এসে সাহ্রি খাওয়ার পর আবার বাসে উঠেছেন। কিন্তু সকাল ৯টা হয়ে গেলেও খুব বেশি দূর যেতে পারেননি তিনি। বৃষ্টি আর যানজটে আটকে থেকে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছেন।
বগুড়াগামী আরেক যাত্রী শিউলি আক্তার বলেন, ছোট বাচ্চা নিয়ে বাসে বসে থাকা খুব কষ্টের। না আছে ঠিকমতো খাবার, না আছে বিশ্রামের সুযোগ। কখন বাড়ি পৌঁছাবেন, জানেন না।
রেলপথ: লাইনচ্যুতি ও শিডিউল বিপর্যয়
ঈদযাত্রার এই ভোগান্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রেল দুর্ঘটনা। বগুড়ার সান্তাহার এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় প্রায় ২১ ঘণ্টা উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল।

বুধবার (১৮ মার্চ) দুপুর ২টার দিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সান্তাহার জংশন অতিক্রম করার কিছুক্ষণ পরই বাগবাড়ী এলাকায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
দুর্ঘটনায় ট্রেনটির ৯টি কোচ লাইনচ্যুত হয়। ফলে ঈদের আগে যাত্রাপথে থাকা হাজারো যাত্রী আটকা পড়েন। অনেক ট্রেন বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ায় কমলাপুর রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়।
অনেক যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে উঠে যাত্রা করেছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময়ের উদ্ধার অভিযানের পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলেও ধীরগতিতে চলাচল করছে ট্রেনগুলো।

অনেক যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে উঠে যাত্রা করেছেন। ছবিঃ সংগৃহীত
দুর্ঘটনার পরপরই রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ঈশ্বরদী থেকে একটি এবং পার্বতীপুর থেকে আরেকটি রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। সারারাত ধরে চলে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে লাইনচ্যুত বগি সরানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামতের কাজ।
রেলওয়ে পশ্চিম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহমদ হোসেন মাসুম জানিয়েছেন, টানা উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে লাইনচ্যুত বগিগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং রেললাইন চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। আপাতত ট্রেন চলাচল শুরু হলেও দুর্ঘটনাস্থল এলাকায় ট্রেনগুলোকে ধীরগতিতে চলাচল করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে স্থায়ীভাবে রেললাইন পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে।
নৌপথেও ঝুঁকি: সদরঘাটে মৃত্যুর ঘটনা
সড়ক ও রেলের পাশাপাশি নৌপথেও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র স্পষ্ট। সদরঘাটে দুই লঞ্চের ধাক্কায় এক যাত্রীর মৃত্যু এবং দুজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঈদযাত্রার ভয়াবহ দিক তুলে ধরেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একটি লঞ্চ ছাড়ার সময় অন্য একটি লঞ্চের ধাক্কায় মাঝখানে পড়ে যায় একটি নৌকা। এতে এক যাত্রী পিষ্ট হয়ে মারা যান এবং আরও কয়েকজন আহত হন। ঘটনার পরও যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব লক্ষ করা গেছে।

স্ত্রীকে নিয়ে হলো না বাড়ি ফেরা, প্রাণ গেল দুই লঞ্চের চাপায়, ছবি-সংগৃহীত
দুই লঞ্চের ধাক্কার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, ‘আসা যাওয়া-৫’ নামে লঞ্চটি সদরঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে বের হচ্ছিল। এ সময় নৌকা পাশে ভিড়িয়ে ওই লঞ্চে যাত্রী উঠছিলেন। তখন ‘জাকির সম্রাট-৩’ নামের একটি লঞ্চ পেছন থেকে ধাক্কা দিলে দুই লঞ্চের মধ্যে পড়ে নৌকাটি। এ সময় দুই লঞ্চের চাপায় প্রাণ হারান সোহেল, গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একটি লঞ্চ সদরঘাট ছেড়ে যাওয়ার জন্য পেছানো শুরু করলে দুই লঞ্চের চাপায় পড়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি। এতে এক যাত্রীর পা কেটে যায়। আরেক যাত্রী পিষ্ট হয়ে পানিতে পড়ে যান।
ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার খালেদা ইয়াসমিন আজ রাত সাড়ে ৮টায় সমকালকে বলেন, লোকমুখে দুজন পানিতে নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।

লঞ্চ ঘাটে যাত্রীদের ভিড়। ছবিঃ সংগৃহীত
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বাড়ছে
ঈদযাত্রা মানেই বাড়তি দুর্ঘটনার আশঙ্কা। এবারও দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল(১৮ মার্চ) রাজশাহী, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম ও ঝিনাইদহে পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
রাজশাহীতে ট্রাকচাপায় বাবা-ছেলের মৃত্যু, মৌলভীবাজারে গাছ ভেঙে পড়ে নারীর মৃত্যু, চট্টগ্রামে বাস দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এবং ঝিনাইদহে ট্যাংকারের ধাক্কায় নারী নিহত হওয়ার ঘটনা যাত্রাপথের ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
অতিরিক্ত ভাড়া ও পরিবহন সংকট
ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য গত ২০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করতে চলেছে বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি। গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদযাত্রা ঘিরে ভাড়া বৃদ্ধির বিশৃঙ্খলা ও যাত্রী হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরেন।

রাজধানী ছাড়ার শুরুতেই মানুষের ঢল নেমেছে মহাসড়কে। ছবিঃ সংগৃহীত
যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে অনুযায়ী, এবারের ঈদে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আন্তঃজেলা এবং দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যাতায়াত করতে পারে। এ ছাড়া রাজধানীসহ দেশের শহরকেন্দ্রিক সিটি সার্ভিসের বাসে আরও প্রায় ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৪ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের যাতায়াত, ঈদে টিকিটসংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যাতায়াতে ৮৭ শতাংশে গড়ে প্রতি টিকিটে ৩৫০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। এর ফলে দূরপাল্লার যাত্রীদের মোট ১২১.৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে। ঢাকাসহ শহরের সিটি সার্ভিসে ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রী ৮৭ শতাংশে প্রতি টিকিটে গড়ে ৫০ টাকা অতিরিক্ত দিলে ২৬.১ কোটি টাকা ভাড়া গুনতে হবে। ফলে এবারের ঈদে বাস-মিনিবাসে মোট প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হবে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদ উপলক্ষে অনেক পরিবহনেই দ্বিগুণ বা তার বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। যদিও পরিবহন মালিকরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে বাস্তবে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বহু অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পর্যাপ্ত বাস না থাকায় অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে প্রাইভেটকার বা মোটরসাইকেলে যাত্রা করছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও সীমাবদ্ধতা
যানজট নিরসন ও যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে হাইওয়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় তাদের তৎপরতা চোখে পড়েনি। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ না থাকায় যানজট আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন চালকরা।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সামাল দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
কোনাবাড়ী নাওজোর হাইওয়ে থানার ওসি সওগাতুল আলম বলেন, রাত থেকেই আমরা যানজট নিরসনে কাজ করছি। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সকাল পর্যন্ত চাপ বেশি থাকলেও এখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে।
তিনি জানান, যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। আশা করছেন পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সবাই কিন্তু নির্ধারিত ভাড়া নিচ্ছেন। দুএকটি পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে আরও ২০-৩০ টাকা কম নিচ্ছে। এখানে পুলিশ ও র্যাবের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, পর্যবেক্ষক দল আছে, সব জায়গায় ভাড়ার তালিকা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ বেশি ভাড়া চাইলে অভিযোগ পাওয়ামাত্র ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ-র্যাবের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও পর্যবেক্ষক দল জানিয়েছে খুব একটা অভিযোগ তারা পাননি।’
তিনি বলেন, খুব একটা ব্যত্যয় এখানে ঘটেনি, নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে এবং বাসগুলো যথা সময়ে ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীরা কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রুটে টিকিট আছে, কয়েকটি রুট আছে যেখানে ইতোমধ্যে সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। যারা বাসে যাচ্ছেন, তারা নির্বিঘ্নে-নিরাপদে যেতে পারছেন। কোনো হয়রানি অথবা কোনো বিড়ম্বনার শিকার তারা হচ্ছেন না।
যাত্রীদের মানসিক চাপ ও ক্লান্তি
শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, মানসিক চাপও বেড়েছে যাত্রীদের মধ্যে। কখন গন্তব্যে পৌঁছাবেন, আদৌ সময়মতো পৌঁছাতে পারবেন কি না—এই অনিশ্চয়তা যাত্রীদের ক্লান্ত করে তুলছে। শিশুদের কান্না, খাবারের অভাব, বিশ্রামের অভাব—সব মিলিয়ে যাত্রা হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
প্রতিবছর একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি প্রশাসনের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি তুলে ধরছে। সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ভাড়া নির্ধারণ, রেল ও নৌপথের নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ঈদকে কেন্দ্র করে নয়, সারাবছরই পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। না হলে প্রতি বছরই ঈদযাত্রা একই দুর্ভোগের গল্প হয়ে থাকবে।