বাংলাদেশ

১৩৩ অধ্যাদেশে বড় সিদ্ধান্ত

সংসদে বাদ পড়ছে গণভোটসহ অন্তর্বর্তী সরকারের ২০টি অধ্যাদেশ

  • 3:08 am - April 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৬১ বার
জাতীয় সংসদ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩ এপ্রিল-  গণভোট, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে জাতীয় সংসদে বড় ধরনের সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়েছে সরকার ও সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে কোনগুলো বহাল রাখা হবে, কোনগুলো সংশোধন করা হবে আর কোনগুলো বাদ পড়বে—তা নিয়ে বিস্তারিত সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে সংসদে। এতে করে দেশের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপন করা হয় এবং সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত হয়ে প্রতিটি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে সংসদে পাস করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এসব অধ্যাদেশে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই আইন হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে নতুনভাবে সংসদে বিল হিসেবে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। আর ২০টি অধ্যাদেশ এখনই অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না, ফলে নির্ধারিত সময় শেষে এগুলোর কার্যকারিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে।

এই ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে আবার চারটি সরাসরি বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি ১৬টি অধ্যাদেশ ভবিষ্যতে আরও যাচাই-বাছাই করে শক্তিশালী করে নতুনভাবে আনার কথা বলা হয়েছে।

যে চারটি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং এর সংশোধনী অধ্যাদেশ ২০২৬। এসব অধ্যাদেশ নিয়ে বিশেষ করে বিচার বিভাগ সম্পর্কিত বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল। যেমন বিচারক নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ছিল। তবে এসব বিষয়ে মতভেদ থাকায় সেগুলো বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে যে ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ এবং তথ্য অধিকার সংশোধন অধ্যাদেশ। এসব বিষয়ে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে শক্তিশালী আইন আকারে আনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশটি ছিল বিশেষভাবে আলোচিত, যা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোট আয়োজনের বিধান রাখতে চেয়েছিল।

এছাড়া রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যেখানে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নকে আলাদা করার প্রস্তাব ছিল। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা গিয়েছিল। তাই এটিও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট একাধিক অধ্যাদেশ, শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন, স্মৃতি জাদুঘর স্থাপন এবং দায়মুক্তি সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। এছাড়া ব্যাংকিং, জ্বালানি, নিরাপত্তা, সাইবার সুরক্ষা, সরকারি চাকরি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনসংক্রান্ত বহু অধ্যাদেশ এই তালিকায় রয়েছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কিছু অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রশাসনে বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে, যা নিয়েও বিরোধী দলের আপত্তি রয়েছে।

এদিকে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে সংসদে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন, শ্রম আইন, পুলিশ কমিশন গঠন, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং মানবপাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের সংশোধন আনা হবে, তা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে নতুন বিল আকারে উপস্থাপন করবে।

সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যেখানে নির্দিষ্ট কোনো সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হয়। এটি নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে এবং সংশোধনের পর তা সংসদে আনা হবে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে বড় একটি অংশ বহাল থাকলেও উল্লেখযোগ্য কিছু অধ্যাদেশ বাতিল বা স্থগিত হচ্ছে। এর ফলে দেশের আইন কাঠামোতে নতুন করে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবিধান অনুযায়ী, কোনো অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে তা কার্যকারিতা হারায়। ফলে যে ২০টি অধ্যাদেশ অনুমোদন পাচ্ছে না, সেগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বাতিল হয়ে যাবে।

এই পুরো প্রক্রিয়ার দিকে এখন নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের। কারণ এসব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ আইন কাঠামো, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং বিচারব্যবস্থার দিকনির্দেশনা।

এই শাখার আরও খবর

ইসরায়েলের নির্বাচনে কে কী বললেন, আর ফলাফলে কার অবস্থান কোথায়?

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো দল বা জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে নেই। প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন…

পাবনায় রাতের আঁধারে শ্রমিক লীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : পাবনার আতাইকুলায় পুষ্পপাড়া হাটে গুলি করে শ্রমিক লীগ নেতাসহ দুজনকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত পৌনে ৮টার দিকে হাটের…

ডিসেম্বরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ঘটতে যাচ্ছে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে এবং দেশের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোতে কার প্রভাব কতটা থাকবে, এই প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখে একাধিক সাম্প্রতিক ঘটনাকে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। তাঁর…

জাপানি ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা শেখাতে বাংলাদেশে নতুন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ

জাপানে ও বাংলাদেশে কর্মসংস্থানে আগ্রহী তরুণদের জাপানি ভাষা শেখানো ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে জাপানের প্রতিষ্ঠান ওনোদেরা ইউজার রান এবং…

মেয়াদ শেষ হচ্ছে গঙ্গার পানি চুক্তির, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী ঢাকা

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে যাওয়ায় ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তির আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। নতুন চুক্তি না হলে দেশে…

শেখ হাসিনার জাতিসংঘে চিঠি: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অর্জনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত অসাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে জাতিসংঘের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au