চিকিৎসক ডা. কামদা প্রসাদ সাহা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল- কুমিল্লার বহুল আলোচিত তনু হত্যা মামলার এক দশক পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত কমিটির প্রধান চিকিৎসক ডা. কামদা প্রসাদ সাহা। সাম্প্রতিক সময়ে মামলার এক সন্দেহভাজন আসামি গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ঘিরে নতুন করে সমালোচনা, গুঞ্জন এবং দেশত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ফেসবুকে একটি দীর্ঘ আবেগঘন বক্তব্য প্রকাশ করেছেন।
সোমবার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া ওই বক্তব্যে ডা. কামদা প্রসাদ সাহা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাকে ঘিরে যে ধরনের সমালোচনা, গালাগালি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তাতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তিনি দাবি করেন, কোনো ধরনের ব্যক্তিগত অপরাধ না করেও তাকে লক্ষ্য করে একটি পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০১৬ সালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে কর্মরত থাকাকালে তনুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য আনা হয়। প্রথম ময়নাতদন্তটি বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য একজন চিকিৎসক সম্পন্ন করেন এবং সেই প্রতিবেদনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। পরে ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হলে আদালতের নির্দেশে তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ বোর্ড গঠন করে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করা হয়, যার প্রধান ছিলেন তিনি।
ডা. কামদা প্রসাদ সাহা তার বক্তব্যে বলেন, দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের সময় মরদেহটি কবর থেকে উত্তোলনের পর অনেকটাই পচে গিয়েছিল। ফলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, যা ফরেনসিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য।
তিনি আরও বলেন, তনুর ব্যবহৃত পোশাকসহ বিভিন্ন নমুনার ডিএনএ পরীক্ষায় তিনজন পুরুষের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল এবং সেটি রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। তবে কোথাও বলা হয়নি যে ভুক্তভোগী স্বেচ্ছায় কোনো সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তার দাবি, এই বিষয়টি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সেই ভুল বোঝাবুঝির দায় এককভাবে তার ওপর চাপানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তাকে নিয়ে দেশত্যাগের গুঞ্জন সম্পর্কেও বক্তব্য দেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, একটি ভাইরাল পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তিনি যদি কোনো অপরাধ না করে থাকেন, তাহলে কেন দেশ ছেড়ে পালাবেন। বরং তার মতে, কোনো একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে।
ডা. কামদা প্রসাদ সাহা আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘ পেশাজীবনে তিনি হাজারো ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছেন এবং কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। তনু হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও তিনি যথাযথ তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি চান এবং আদালতকে সহায়তা করতে প্রস্তুত আছেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান প্রচারণা তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, এই পরিস্থিতি তার সম্মান, পরিবার, সামাজিক অবস্থান সবকিছুকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে এবং তিনি নিজের জীবন নিয়েও শঙ্কিত বোধ করছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। পরদিন সেনানিবাস এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ তদন্তেও রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় পরবর্তীতে মামলাটি একাধিক সংস্থার হাতে যায়।
সর্বশেষ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের মাধ্যমে তনুর পোশাক থেকে তিনজনের ডিএনএ শনাক্ত করা হয়, যারা সবাই সাবেক সেনা সদস্য। তাদের মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে তাকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।