আরজি কর কাণ্ডে তিন আইপিএস কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত
মেলবোর্ন, ১৫ মে- আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তিন জ্যেষ্ঠ আইপিএস কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই…
মেলবোর্ন, ১৫ মে- ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং হিন্দুত্ববাদী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে বাড়তে থাকা সমালোচনার মুখে এবার নিজেদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে বৈশ্বিক প্রচারণায় নামছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত এই হিন্দুত্ববাদী সংগঠন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে সফরের পরিকল্পনা নিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, তাদের বিরুদ্ধে যে ‘ভুল ধারণা’ ও ‘বিভ্রান্তিকর প্রচারণা’ চালানো হচ্ছে, তা মোকাবিলাই এই সফরের মূল উদ্দেশ্য।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার আরএসএস আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্যোগের ঘোষণা দেয়। এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত এলো, যখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ভারতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এই দ্বিদলীয় কমিশন বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেসকে নীতিগত সুপারিশ দিয়ে থাকে।
আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে বলেন, ইতোমধ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ব্রিটেনে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে অংশ নিয়েছেন এবং সামনে আরও সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। দিল্লিতে আরএসএসের সদ্য নির্মিত ১২ তলা সদরদপ্তরে বিদেশি গণমাধ্যমের জন্য আয়োজিত এক বিরল ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “আরএসএস সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পরিসরে কিছু ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। আমরা সেগুলো দূর করতে চাই।”
তিনি বলেন, আরএসএসকে অনেক সময় ‘আধা সামরিক সংগঠন’, ‘হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী গোষ্ঠী’ কিংবা ‘সমাজকে পেছনের দিকে ঠেলে নেওয়া সংগঠন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এমনকি অভিযোগ করা হয়, সংগঠনটি ভারতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করতে চায়। তবে হোসাবলের দাবি, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আরএসএস নিজেদের একটি ‘হিন্দুকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত আন্দোলন’ হিসেবে পরিচয় দেয়। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের মূল লক্ষ্য হলো হিন্দু সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রক্ষা করা এবং ভারতকে ‘গৌরবের শিখরে’ পৌঁছে দেওয়া।
১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আরএসএস ভারতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে বিজেপির সাংগঠনিক বিস্তার এবং সারা দেশে দলটির রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির পেছনে আরএসএসের বিশাল স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ককে বড় ভূমিকা হিসেবে দেখা হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তরুণ বয়সে আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত হন এবং সেখান থেকেই তার রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়।
তবে সংগঠনটি শুরু থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৪৮ সালে আরএসএস নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। হত্যাকারী নাথুরাম গডসে একসময় আরএসএসের সদস্য ছিলেন। যদিও সংগঠনটি পরে হত্যাকাণ্ডের দায় অস্বীকার করে।
ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বহুদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, আরএসএস বিভাজনমূলক ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে উৎসাহ দিচ্ছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী একাধিকবার বলেছেন, আরএসএসের আদর্শ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য হুমকি এবং এটি মুসলিমসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা উসকে দেয়।

মুম্বাইতে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন আরএসএস প্রধান। ছবিঃ বিবিসি
এদিকে আরএসএসের আন্তর্জাতিক তৎপরতা শুধু ভাবমূর্তি রক্ষাতেই সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সংগঠনটির নেতারা ইতোমধ্যে ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই উদ্যোগের পেছনে ভূমিকা রাখছে। নরেন্দ্র মোদির সরকার ইতোমধ্যে আরএসএসের দীর্ঘদিনের দুটি প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন করেছে। একটি হলো অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানে রাম মন্দির নির্মাণ, অন্যটি জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল।
হোসাবলে আরও দাবি করেন, আরএসএস এখন হিন্দু সমাজের ভেতরে জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যেও কাজ করছে। তবে সমালোচকদের মতে, সংগঠনটির কার্যক্রম এখনো মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামাজিক বৈষম্য, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং জাতপাতভিত্তিক অসন্তোষ বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিরোধী দলগুলো সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উদ্বেগকে কাজে লাগাতে সক্ষম হওয়ায় বিজেপি আগের তুলনায় চাপে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং ‘সংখ্যালঘু নিপীড়নের সংগঠন’ হিসেবে তৈরি হওয়া ভাবমূর্তি পাল্টাতে আরএসএসের এই বিশ্ব সফরকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্রঃ রয়টার্স
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au