বাংলাদেশ

চাকরি নেই, শান্তিও নেই

‘বেকার’ তকমায় ভেঙে পড়ছে বাংলাদেশের তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য

  • 7:42 pm - May 15, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৭১ বার
‘বেকার’ তকমায় ভেঙে পড়ছে বাংলাদেশের তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৫ মে- বাংলাদেশে বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি অনেক মানুষের জন্য গভীর মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক চাপ এবং আত্মসম্মানবোধের সঙ্গে প্রতিদিনের এক নীরব লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। সমাজে পরিচিত একটি প্রশ্ন, “কী করো?” অনেকের কাছে সাধারণ হলেও একজন বেকার মানুষের জন্য এটি হয়ে ওঠে অস্বস্তি, অপমান এবং হতাশার প্রতীক।

বাংলাদেশি সমাজে ‘বেকার’ শব্দটির সঙ্গে এখনো এক ধরনের নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি জড়িয়ে আছে। যারা দীর্ঘ সময় চাকরি পান না, তাদের অনেকেই বলেন, এই সময়টা তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায়।

চাকরিহীন তরুণদের জীবনযাপনেও দেখা যায় এক ধরনের পরিবর্তন। অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন, সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন, দিনের বেলাতেও ঘুমিয়ে থাকেন। তারা বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলেন কিংবা বাড়ি ফিরতেও অনীহা দেখান। সামাজিক মেলামেশা কমে যায়, মুখে স্থায়ী বিষণ্নতার ছাপ দেখা দেয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে তারা চেষ্টা করছেন না, কিংবা বাস্তবতা এড়িয়ে চলছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেও এখনো চাকরি না পাওয়া রাহাত কবির বলেন, “যেখানেই যান, একই প্রশ্ন বারবার শুনতে হয়। কেউ হয়তো ভালোবেসে জানতে চায়, কিন্তু অনেক সময় মনে হয় যেন ইচ্ছা করেই অপমান করার জন্য প্রশ্ন করা হচ্ছে। এমনকি তারা সেটা না চাইলেও নিজের মনেই একসময় এমন ধারণা তৈরি হয়।”

২০২৯ পর্যন্ত ন্যূনতম উন্নয়নশীল দেশ মর্যাদা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। ছবিঃ সংগৃহীত

বেকারত্বের দীর্ঘ সময় একজন মানুষকে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসহীন করে তোলে। প্রতি সপ্তাহে নতুন চাকরির জন্য আবেদন করা, সাক্ষাৎকারে ডাক না পাওয়া কিংবা ভাইভা বোর্ডে বাদ পড়ে যাওয়া একজন তরুণের আশা-ভরসাকে বারবার ভেঙে দেয়।

প্রায় ১৪ মাস বেকার থাকা কে জামান বলেন, “মানুষ বলে, একবার তলানিতে পৌঁছালে এরপর আর ওপরে ওঠা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু বাস্তবে সেই তলানি থেকে উঠে আসা এত সহজ নয়।”

তিনি আরও বলেন, “চাকরি না থাকলে নিজের মধ্যেই এক ধরনের অন্ধকার তৈরি হয়। তখন মানুষ নিজেকেই সন্দেহ করতে শুরু করে। ছোটখাটো বিষয়ও মানসিকভাবে আঘাত করতে থাকে। এই সময় আত্মবিশ্লেষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অভিজ্ঞতা একজন মানুষের জীবনকে গভীরভাবে বদলে দেয়।”

কে জামান জানান, বন্ধুদের সমর্থন পেলেও তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন। তার ভাষায়, “অনেক সময় বুঝতে পারতাম না কে কী উদ্দেশ্যে কথা বলছে। হয়তো বন্ধুরা ভালোবেসেই কিছু বলত, কিন্তু তখন নিজের মনকেই বিশ্বাস করতে পারতাম না। মনে হতো সবাই হয়তো আমাকে নিয়ে খোঁচা দিচ্ছে।”

মেহেদী হাসান নামে আরেক তরুণ বলেন, “আমি নিজেকে কখনো বেকার ভাবিনি। কিন্তু পরিবার, বন্ধু, আশপাশের মানুষ সবাই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে আমি বেকার। যতই এড়িয়ে যেতে চেয়েছি, এই পরিচয় থেকে বের হতে পারিনি।”

যাদের পরিবার আছে বা পরিবারের দায়িত্ব বহন করতে হয়, তাদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার প্রত্যাশা থাকে, কিন্তু বাস্তবে সেই সক্ষমতা থাকে না। প্রতিবার অন্যের কাছে টাকা চাইতে গেলে আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। ধীরে ধীরে আত্মঘৃণা ও মানসিক অবসাদ বাড়তে থাকে।

মেহেদী বলেন, “আমার বেকারত্ব যেন পরিবারের সবার আলোচনার বিষয় হয়ে গিয়েছিল। আত্মীয়স্বজন বাবাকে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করত। বাবা আমাকে সমর্থন করতেন, কিন্তু রাতের খাবারের টেবিলেও যখন পরিকল্পনার কথা জিজ্ঞেস করতেন, আমার কাছে কোনো উত্তর থাকত না। পরে আমি পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়াই বন্ধ করে দিই।”

শুধু পরিবার নয়, আশপাশের প্রতিবেশী, পরিচিতজন এমনকি যাদের সঙ্গে খুব একটা কথাও হয় না, তারাও চাকরি নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চাপ আরও বাড়তে থাকে।

রাহাত বলেন, “প্রথম দিকে বিষয়টা তেমন কিছু মনে হয় না। কিন্তু ধীরে ধীরে এটা আপনাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। তখন মনে হয়, আমি কি সারাজীবন অন্যের ওপর নির্ভর করেই থাকব? এটাই কি আমার জীবন? এরপর মানুষ উদাহরণ টানতে শুরু করে, ‘দেখো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়েও চাকরি পায়নি।’”

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘ সময় চাকরি না পাওয়ার ফলে হতাশা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের সংকট ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। একের পর এক ব্যর্থতা একজন মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। ফলে আত্মোন্নয়ন বা পড়াশোনার প্রতিও আগ্রহ কমে যায়, যা আবার নতুন ব্যর্থতার কারণ হয়।

বর্তমানে একটি গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা কে জামান অবশ্য এই অভিজ্ঞতার ইতিবাচক দিকও খুঁজে পান। তিনি বলেন, “পেছনে তাকালে মনে হয়, বেকারত্ব আমাকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করেছে। এটা ছিল বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।”

তবে যারা এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তারা প্রায় সবাই একমত যে সমাজের অপ্রয়োজনীয় চাপ ও নেতিবাচক মনোভাব এই সময়টাকে আরও কঠিন করে তোলে। তাদের মতে, কেউ ইচ্ছা করে বেকার থাকে না। তাই চাকরিহীন তরুণদের প্রতি সমাজের আরও সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী হওয়া প্রয়োজন।

সূত্রঃ এশিয়ান নিউজ নেটওয়ার্ক

এই শাখার আরও খবর

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

সিডনি ও পার্থে বিএইচএসএএ’র শারদীয় পূজা পরিক্রমা সম্পন্ন

শতদল তালুকদার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও পার্থে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএইচএসএএ’র (BHSAA) শারদীয় দুর্গাপূজা পরিক্রমা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য…

মহানবমী আজ, কাল প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)। দিনভর নানা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ঝরল ১০ প্রাণ, আহত আরও ২০

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: নাটোরের বড়াইগ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ। যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন।…

‘আমি ভয় পাই না’, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা আবারও বললেন শেখ হাসিনা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা আবারও জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হতে পারেন বলে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au