ডিজিটাল যুগে উগ্রবাদের বিস্তার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ভুয়া তথ্য, ঘৃণামূলক প্রচারণা ও অনলাইন উসকানি মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কৌশল। Photo: Meta AI
মেলবোর্ন, ১৯ জুলাই: বাংলাদেশে সহিংস উগ্রবাদের প্রশ্ন আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। গত ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দেন যে, তাঁর সরকার উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই চ্যালেঞ্জ কোনো একক সরকার বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কীভাবে মোকাবিলা করবে, তার ওপর দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক সম্প্রীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।
টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীর সংযুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য স্থিতিশীলতা কেবল রাজনৈতিক লক্ষ্য নয়, এটি অর্থনৈতিক অপরিহার্যতাও। বিনিয়োগকারীরা শুধু অবকাঠামো বা বাজারের সম্ভাবনা বিবেচনা করেন না; তারা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের প্রতি আস্থাকেও গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাই দেখিয়েছে, উগ্রবাদী সহিংসতার মানবিক, অর্থনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) দেশের ৬৩টি জেলায় সমন্বিত বোমা হামলা চালিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ৪৫০টিরও বেশি বিস্ফোরক বিস্ফোরণ ঘটায়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে পরিচালিত ওই হামলা বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ জঙ্গিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে।
এর এক দশকেরও বেশি সময় পরে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি হামলা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আলোচিত ও ক্ষতিকর সন্ত্রাসী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রায় ১২ ঘণ্টার অবরোধে অধিকাংশই বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জন জিম্মি এবং দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। ওই হামলা এমন সময় সংঘটিত হয়, যখন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণে এগিয়ে যাচ্ছিল।
উগ্রবাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক সময় তাৎক্ষণিক মানবিক বিপর্যয়ের মতো দৃশ্যমান হয় না। সন্ত্রাসী হামলা ও উগ্রবাদী তৎপরতা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়ায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ওপর, যাদের ভবিষ্যৎ একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিস্তার দেখিয়েছে, একবার কোনো উগ্রবাদী সংগঠন সাংগঠনিক সক্ষমতা ও আদর্শিক প্রভাব অর্জন করলে তা রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হতে পারে। সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়ে গেলে এসব সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশেও জনপরিসরে উগ্রবাদী বক্তব্য ও বর্ণনার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে এই চ্যালেঞ্জ ডিজিটাল জগতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলো দ্রুত ভুয়া তথ্য, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা ছড়িয়ে দিতে পারছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন ক্ষোভকে বাস্তব সহিংসতায় রূপান্তরিত করছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পরবর্তী অস্থিরতার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা ও সংগঠনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ওই ঘটনার পর সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে একটি কূটনৈতিক মিশন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশনের বাইরে সহিংস বিক্ষোভে কূটনৈতিক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনাও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন সময় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপের মুখে পড়েছে। উদীচী ও ছায়ানট-এর মতো প্রতিষ্ঠান, যারা দেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের কার্যক্রম বারবার উগ্রবাদী মনোভাবাপন্ন গোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বৈধ রাজনৈতিক সমালোচনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে বা বাইরে অবস্থান করে কেউ যেন সহিংসতা, ভীতি সৃষ্টি কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলায় উসকানি দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের উগ্রবাদ দমন কার্যক্রম নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দেশে ইসলামী উগ্রবাদের পুনরুত্থানের কোনো সুযোগ নেই এবং নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই সরকারের অগ্রাধিকার। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সমালোচক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর একাংশের দাবি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সমন্বয়ের ঘাটতি উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর দৃশ্যমানতা বাড়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে অনলাইনে উগ্র মতাদর্শ-সম্পর্কিত ব্যক্তিদের সক্রিয়তা এবং জনসমক্ষে তাদের কার্যক্রম বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকদের দাবি, এসব ঘটনার অনেকগুলোই সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অংশ, সংগঠিত সন্ত্রাসবাদের পুনরুত্থানের প্রমাণ নয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা ও সেখান থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বন্দির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। যদিও পরে অনেক পলাতককে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়, তবুও ঘটনাটি শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কার্যকর গোয়েন্দা সমন্বয়ের গুরুত্ব নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কারামুক্ত হয়ে প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়া এবং নিরাপত্তা সংস্থার ভাষ্যমতে নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এর আদর্শিকভাবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির কর্মকাণ্ডও উগ্রবাদ মোকাবিলার কৌশল নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনায় একদিকে সহিংসতায় উসকানি প্রতিরোধ, অন্যদিকে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উগ্রবাদী শক্তিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার প্রবণতা থেকেও বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য উগ্রবাদবিরোধী এই লড়াই মূলত ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। যে দেশ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে চায়, তার জন্য স্থিতিশীলতা, উন্মুক্ততা এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা অপরিহার্য। উগ্রবাদ সেই সম্ভাবনার বিপরীতে নিয়ে আসে বিচ্ছিন্নতা, ভয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
তাই উগ্রবাদ মোকাবিলায় কেবল নিরাপত্তা অভিযানই যথেষ্ট নয়। শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, দায়িত্বশীল জনআলোচনা এবং ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও, সহিংসতা ও উগ্রবাদ থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা ধারাবাহিকভাবে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং সহনশীলতার নীতি সমুন্নত রাখতে পারে তার ওপর। গত কয়েক দশকের উন্নয়ন অর্জন নতুন প্রজন্মের জন্য যে ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তা রক্ষা করতে হলে নিশ্চিত করতে হবে—উগ্রবাদ ও সহিংসতা যেন কখনোই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করতে না পারে।
– ডেইলি সান