অস্ট্রেলিয়া

পলিন হ্যানসনের অবস্থান প্রত্যাখ্যান জন হাওয়ার্ডের: মনোকালচার অর্থহীন

যুদ্ধোত্তর অভিবাসনকে অস্ট্রেলিয়ার বড় সাফল্য হিসেবে বর্ণনা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর; বহুজাতিক ও বহু-ধর্মীয় সমাজের পক্ষে রক্ষণশীলদের সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান

  • 11:45 pm - August 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৮ বার
ওয়ান নেশনের ‘একক সংস্কৃতি’ প্রতিষ্ঠার প্রচারণাকে অর্থহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন সাবেক অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড। ছবি: ওটিএন বাংলা

মেলবোর্ন, ৩ আগস্ট: অস্ট্রেলিয়ায় ‘মনোকালচার’ বা একক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার পক্ষে ওয়ান নেশনের প্রচারণাকে ‘অর্থহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন কর্মসূচিকে একটি অসাধারণ সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার বাস্তবতার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ বহুসাংস্কৃতিক সমাজের ধারণাই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দ্য অস্ট্রেলিয়ান-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে হাওয়ার্ড বলেন, অভিবাসনের ক্ষেত্রে ‘মনোকালচার’ বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে, তা তাঁর কাছে স্পষ্ট নয়। তাঁর মতে, এ শব্দকে কেন্দ্র করে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ক সাধারণ মানুষের বাস্তব উদ্বেগ থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে। বেশির ভাগ অস্ট্রেলিয়ান স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত অভিবাসনকে সমর্থন করেন, তবে তাঁরা চান জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আবাসন, অবকাঠামো ও সরকারি সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হোক।

হ্যানসনের প্রচারণায় হাওয়ার্ডের সরাসরি হস্তক্ষেপ

১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জন হাওয়ার্ডের এই মন্তব্যকে পলিন হ্যানসন ও ওয়ান নেশনের সাম্প্রতিক প্রচারণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হাওয়ার্ড দীর্ঘদিন ধরে লেবার সরকারের বহুসাংস্কৃতিক নীতির সমালোচক ছিলেন। তবে তাঁর মতে, রক্ষণশীল রাজনীতিকদের এখন অস্ট্রেলিয়ার বহু-জাতিগোষ্ঠী ও বহু-ধর্মীয় সমাজের পক্ষে একটি সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যা তুলে ধরা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, কোয়ালিশন এখনো এই বিষয়ে কার্যকর রক্ষণশীল অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, একদিকে বিভিন্ন বংশোদ্ভূত মানুষ একটি অভিন্ন অস্ট্রেলীয় নাগরিকত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন। অন্যদিকে, ‘মনোকালচার’ বলতে কেউ কেউ পূর্বনির্ধারিত অস্ট্রেলীয় পরিচয় থেকে সামান্য বিচ্যুতিও মেনে না নেওয়ার অবস্থান বোঝাতে পারেন। এ ধরনের অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরির কোনো প্রয়োজন নেই।

হাওয়ার্ডের মতে, অস্ট্রেলিয়ার মানুষ অভিবাসনকে সাধারণত ইতিবাচকভাবে দেখেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তা নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং বিদেশের সংঘাত, ঘৃণা ও বিভাজন অস্ট্রেলীয় সমাজে আমদানি করা না হয়।

‘মাল্টিকালচারালিজম’ শব্দেও অস্বস্তি

হাওয়ার্ড জানান, ‘মাল্টিকালচারালিজম’ শব্দটি নিয়েও তিনি সবসময় কিছুটা অস্বস্তি বোধ করেছেন। তাঁর মতে, শব্দটি কখনো কখনো অস্ট্রেলিয়াকে অভিন্ন জাতীয় সমাজের পরিবর্তে পৃথক মূল্যবোধসম্পন্ন বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমষ্টি হিসেবে উপস্থাপন করে।

তিনি মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রেলিয়ায় যে অভিবাসন ঘটেছে, তার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সংঘাত নয়; বরং সাফল্য, সহযোগিতা এবং নতুন নাগরিকদের জাতীয় জীবনে অংশগ্রহণ।

হাওয়ার্ড বলেন, যুদ্ধোত্তর অভিবাসন কর্মসূচি অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি বড় সাফল্য। তবে ‘হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া’ নীতি বিলুপ্ত করতে অনেক সময় লেগেছিল। এ ক্ষেত্রে সাবেক লিবারেল প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড হোল্ট বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

২০০১ সালের সীমান্তনীতির প্রসঙ্গ

অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাওয়ার্ড ২০০১ সালের নির্বাচনী প্রচারণার কথাও স্মরণ করেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, কারা অস্ট্রেলিয়ায় আসবেন এবং কোন পরিস্থিতিতে আসবেন—সে সিদ্ধান্ত অস্ট্রেলিয়াই নেবে।

সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ওই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছিল। নরওয়ের জাহাজ এমভি টাম্পা সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা আশ্রয়প্রার্থীদের অস্ট্রেলিয়ায় নামানোর অনুমতি চেয়েছিল। হাওয়ার্ড সরকার সে অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

হাওয়ার্ডের মতে, অস্ট্রেলিয়ানরা নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন ব্যবস্থার পক্ষে। ইউরোপের বিভিন্ন সীমান্তে অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ও মানবিক সংকটের দৃশ্য এ বিষয়ে জনসমর্থন আরও জোরালো করেছে।

ওয়ান নেশনের সঙ্গে জোট নয়: জেন হিউম

বহুসংস্কৃতিবাদ এবং একক সংস্কৃতির বিতর্কের মধ্যেই লিবারেল পার্টির উপনেতা জেন হিউম জানিয়েছেন, ওয়ান নেশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের কোনো পরিকল্পনা তাঁদের নেই।

এবিসির ইনসাইডার্স অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, লিবারেল পার্টি ওয়ান নেশনের সঙ্গে সরকার গঠন করবে না। লিবারেলরা ইতোমধ্যে ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধ এবং প্রায় ৮০ বছর ধরে এই কোয়ালিশন সফল সরকারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

বিরোধী দলের নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর অভিবাসনকে লিবারেল পার্টির নীতি পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান বিষয় করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমানে অভিবাসীর সংখ্যা অতিরিক্ত এবং আবাসন সংকট কমাতে নতুন বাড়ি নির্মাণের হারের সঙ্গে অভিবাসনের মাত্রা যুক্ত করা উচিত।

তবে পলিন হ্যানসনের ‘মনোকালচার’ নীতি নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করতে টেলর রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়েছেন। লেবার দাবি করছে, ওয়ান নেশনের নীতি মূলত অশ্বেতাঙ্গ অস্ট্রেলিয়ানদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে।

হ্যানসনকে ‘শহীদ’ বানাতে চান না আলবানিজ

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, তিনি পলিন হ্যানসনকে ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে রাজনৈতিক ‘শহীদে’ পরিণত করতে চান না। বরং ওয়ান নেশনের অর্থনৈতিক ও কর্মক্ষেত্র-সম্পর্কিত নীতির ওপরই লেবারের প্রচারণা কেন্দ্রীভূত থাকবে।

আলবানিজের মতে, অস্ট্রেলিয়া কখনোই একক সংস্কৃতির দেশ ছিল না এবং এ ধরনের ধারণা আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মানানসই নয়।

তিনি অভিযোগ করেন, ওয়ান নেশন নিজেদের সাধারণ মানুষের পক্ষে থাকা দল হিসেবে উপস্থাপন করলেও তাদের নীতির মধ্যে রয়েছে মজুরি কমানো, শ্রমিক ইউনিয়ন ও কর্মপরিবেশ দুর্বল করা, নিম্ন আয়ের মানুষের করছাড়ের বিরোধিতা এবং শিল্প ও উৎপাদন খাতে সরকারি সহায়তা প্রত্যাখ্যান করা।

আলবানিজ বলেন, ওয়ান নেশনের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং তাদের প্রকৃত নীতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। দলটি সাধারণ কর্মজীবী অস্ট্রেলিয়ানদের পক্ষে কথা বলার দাবি করলেও তাদের নীতি সেই মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবে না।

নতুন করে জাতীয় পরিচয়ের বিতর্ক

হাওয়ার্ডের বক্তব্যের পর অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পরিচয়, অভিবাসন, বহুসংস্কৃতিবাদ এবং সামাজিক সংহতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

একদিকে ওয়ান নেশন অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতির প্রতি একক আনুগত্যের কথা বলছে। অন্যদিকে হাওয়ার্ডের মতো রক্ষণশীল নেতা বলছেন, বিভিন্ন বংশ ও ধর্মের মানুষ অভিন্ন নাগরিকত্ব, আইন এবং জাতীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে একসঙ্গে বসবাস করতে পারেন।

হাওয়ার্ডের মূল বক্তব্য হলো—অভিবাসনের সংখ্যা, আবাসন ও অবকাঠামোর সক্ষমতা নিয়ে বাস্তব আলোচনা প্রয়োজন; কিন্তু ‘মনোকালচার’ বনাম ‘মাল্টিকালচারালিজম’ শব্দের বিতর্কে আটকে থাকা সমস্যার সমাধান করবে না।

এই শাখার আরও খবর

বেরোবিতে কেন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল ছাত্রদল-শিবির

মেলবোর্ন, ৪ আগস্ট : রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রশিবিরের আয়োজিত একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের…

ঢাকায় মাদ্রাসার বাথরুমে মিলল শিক্ষার্থীর লাশ

মেলবোর্ন, ৪ আগস্ট: ঢাকার কদমতলীর শনিরআখড়া এলাকার একটি মাদরাসার বাথরুম থেকে নাঈম ইসলাম শেখ (১২) নামে এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেল…

জুলাইয়ে রাজনৈতিক ও মব সহিংসতায় নিহত ২৩,নারী-শিশুসহ আহত ৪৭৩

মেলবোর্ন, ৪ আগস্ট: চলতি বছরের জুলাই মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক হয়রানি এবং শ্রমিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক…

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য ঠেকাতে ভারতের সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ

মেলবোর্ন, ৪ আগস্ট: ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তি যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারত সরকারের…

অবসরের পরও লাভবান রাহানে, বিসিসিআইয়ের সর্বোচ্চ পেনশন পাচ্ছেন সাবেক অধিনায়ক

মেলবোর্ন, ৪ আগস্ট : আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না অজিঙ্কা রাহানের। বোর্ডের পেনশন নীতিমালার আওতায়…

জি-স্কপের নতুন যুগ্ম সমন্বয়ক বাচ্চু মিয়া ও আসাদুজ্জামান রিপন

মেলবোর্ন, ৪ আগস্ট: দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করা গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (জি-স্কপ)-এর নতুন যুগ্ম…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au