বাংলাদেশে হামসহ ১০ রোগের টিকার সংকট। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ মার্চ- বাংলাদেশে হামসহ অন্তত ১০টি রোগের টিকার সংকট তৈরি হয়েছে, যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এই সংকটের কারণে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং চলতি মাসে হামে ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে হামের টিকা সরবরাহ শুরু হতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের সংক্রমণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সরকার তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে একটি শিশুর মৃত্যুর পর আইসিইউ ইউনিট মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যে চালু করা হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড, আইসোলেশন সুবিধা এবং ভেন্টিলেটর সরবরাহ করা হয়েছে। মানিকগঞ্জ ও রাজশাহীতেও নতুন ভেন্টিলেটর পাঠানো হয়েছে এবং আরও ২০টি ভেন্টিলেটর সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, ইতিমধ্যে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং অর্থ আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফকে পরিশোধ করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে টিকা সরবরাহ শুরু হবে এবং দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, গত এক দশকে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম থাকলেও ২০১৮ সালের পর বড় কোনো হামের টিকা ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে যেসব শিশু টিকার আওতায় আসেনি বা পরে জন্ম নিয়েছে, তাদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। যারা টিকা পায়নি, তাদের মধ্যেই হামের প্রকোপ বেশি।
বাংলাদেশ টিকা কর্মসূচিতে সফল দেশ হিসেবে পরিচিত। নিয়মিত টিকাদান এবং বিভিন্ন ধরনের টিকা কর্মসূচির কারণে পোলিও ও ধনুষ্টংকার নির্মূল হয়েছে এবং হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ও কার্যক্রমে গাফিলতির কারণে এই সফল কর্মসূচি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
চলতি মাসে ৪১ হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু
চলতি মাসে দেশে হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হয়েছে মোট ৪১ জন। এর মধ্যে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে মারা গেছে ৫ শিশু, মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১৯ শিশু, রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ১২ শিশু, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩ শিশু এবং শরীয়তপুরে ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এত সংখ্যক শিশুর মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বড় ত্রুটি নির্দেশ করছে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে জরুরি তদন্ত প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় গুদামে ১০টি টিকার মজুত শূন্য
ইপিআই কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয়টি টিকার মজুত শূন্য। আইপিভি ও টিসিভি টিকার মজুত জুন পর্যন্ত আছে এবং এইচপিভির মজুত আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত। দেশব্যাপী কোনো কোনো জায়গায় টিকার ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে।
ইপিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি জাতীয় ক্যাম্পেইন চলমান থাকে। এসব ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে যেসব শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়েছে, তাদের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে টিকা সংকট ও জনবল ঘাটতির কারণে শিশু ও মায়েরা ঠিকমতো টিকা পাচ্ছে না।
টিকার অভাবের কারণ
দাতা সংস্থা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে টিকা কেনা হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচিতে (এইচপিএনএসপি) থাকা অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এই ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এরপর থেকে নতুন প্রকল্প–দলিল তৈরি, অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং অর্থছাড়—all-এ বিলম্ব হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের পদ খালি থাকা এবং পরিবর্তনের কারণে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যাহত হয়েছে। এই সময় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং দেশের টিকা কর্মসূচি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
জনবল সংকট ও মাঠপর্যায়ের সমস্যা
দেশের ২৭টি জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, বাকি ৩৭ জেলায় ৪৫ শতাংশ জনবল ঘাটতি রয়েছে। এই কর্মীরা ইউনিয়নের নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের টিকাকেন্দ্রে টিকা দেন। সারা দেশে প্রায় দেড় লাখ টিকাকেন্দ্র থাকলেও কার্যক্রম স্থগিত থাকার কারণে টিকাদান ব্যাহত হচ্ছে।
পোর্টারদের বেতন প্রায় ৯ মাস ধরে বকেয়া থাকার কারণে তাদের অসন্তোষও কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য সহকারীরা তিন দফায় কর্মবিরতিতে যাওয়ায় সারা দেশে টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ফলে কোথাও টিকা নেই, সেখানে হয়তো জনবল আছে। আবার কোথাও জনবল আছে, টিকা নেই। কোনো কোনো জায়গায় দুটিই নেই।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, হামে এত শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটি প্রকাশ করে। তিনি বলেন, কেন টিকা ফুরাল এবং কেন শিশুরা মারা গেল—এর তদন্ত করা জরুরি।
টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চলমান রাখতে মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। টিকা আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হবে। টিকা কমিটি ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই মুহূর্তে টিকার সংকট ও জনবল সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য হলো দেশে হাম ও অন্যান্য প্রতিষেধকযোগ্য রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস করা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছে।