ভয়াবহ ঝড়ে টিনের চালাসহ আকাশে উড়ে গেলেন রিকশাচালক, উত্তর প্রদেশে প্রাণহানি ১১১
মেলবোর্ন, ১৫ মে- ভারতের উত্তর প্রদেশে ভয়াবহ ঝড়, বজ্রপাত ও ভারি বৃষ্টিতে অন্তত ১১১ জন নিহত হয়েছেন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই বেরেলি জেলায় ঘটেছে অবিশ্বাস্য…
মেলবোর্ন, ১৫ মে- বাংলাদেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম ও হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা, যাদের এখনো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলার প্রথম ডোজ নেওয়ার বয়স হয়নি। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের প্রকৃতি, টিকাদানের কভারেজ কমে যাওয়া এবং অপুষ্টি পরিস্থিতি মিলিয়ে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ৮৫ শিশুর বয়স বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৫৪ জনের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৩ শতাংশই এমন শিশু, যারা টিকা গ্রহণের বয়স হওয়ার আগেই হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ২৯ শিশুর মধ্যে ১৯ জনের বয়স ছিল ৯ মাসের নিচে। মৃত বাকি ১০ শিশুর বয়স ছিল ১০ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে। এই ২৯ শিশুর মধ্যে ২৮ জনই রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছিল। চিকিৎসকরা বলছেন, অধিকাংশ শিশুকেই হাসপাতালে আনা হয়েছে রোগের জটিল অবস্থা তৈরি হওয়ার পর।
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে সেখানে হাম ও হামের উপসর্গে ৪৭ শিশুর মৃত্যু হলেও বয়স ও অঞ্চলভিত্তিক তথ্য পাওয়া গেছে ৩৪ জনের। এর মধ্যে ২৯ শিশুর বয়স ছিল ৯ মাসের কম। বাকি ৫ জনের বয়স ৯ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে। মৃত শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫ জন ঢাকার বাসিন্দা, আর বাকি ২৯ জন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছিল।

ঢাকার একটি হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে। ছবিঃ সংগৃহীত
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এম আসমা খান বলেন, হামে আক্রান্ত হওয়ার পর অধিকাংশ শিশুই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই অপুষ্টিতে ভুগছিল। তিনি বলেন, “আমাদের দেশে ৯ মাস বয়সে হামের রুটিন টিকা দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, টিকা পাওয়ার আগেই শিশুরা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, সাধারণত ৯ মাস পর্যন্ত শিশু মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে কিছুটা সুরক্ষা পেয়ে থাকে। কিন্তু এখন সেই সুরক্ষা যথাযথভাবে কার্যকর থাকছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতে এটি আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ২৩ শিশুর মধ্যে ৭ জনের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। বাকি ১৬ শিশুর বয়স ছিল ১০ মাস থেকে ৩ বছরের মধ্যে। এই হাসপাতালে একই সময়ে ভর্তি হওয়া ৪ হাজার ৬৭৯ রোগীর মধ্যে ৮০০ জনের বয়স ছিল ৯ মাসের কম, যা মোট রোগীর ১৭ শতাংশ।
এছাড়া ১০ মাস থেকে ২ বছর বয়সী ১ হাজার ২৪৩ শিশু, ২ থেকে ৫ বছর বয়সী ৯৫৩ শিশু, ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী ৬১৪ শিশু, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৩২৩ জন, ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪৮৮ জন এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সী ২৫৮ জন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
ডিএনসিসি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মাহমুদা ইসলাম স্নিগ্ধা বলেন, মৃত শিশুদের মধ্যে কয়েকজন অ্যাসপিরেশন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। অর্থাৎ শোয়ানো অবস্থায় খাবার খাওয়ানোর কারণে খাবার পাকস্থলীতে না গিয়ে ফুসফুসে চলে গেছে এবং সেখানে সংক্রমণ তৈরি হয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ শিশুর মধ্যে হাম ছাড়াও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং হৃদযন্ত্রের জটিলতা দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২১ জেলার ৬০টি নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যুর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃত শিশুদের প্রায় অর্ধেকেরই টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। এর মধ্যে ২৯ শিশু ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা গেছে। এমনকি ১৫ শিশুর বয়স ছিল ৬ মাস বা তারও কম।

হামের টিকা। ছবি: সংগৃহীত
জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, এবার হাম ভাইরাসের সংক্রমণ অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে। তিনি বলেন, “আগেও ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ইমিউনিটি গ্যাপ ছিল। কিন্তু টিকার উচ্চ কভারেজের কারণে ভাইরাস এত বেশি ছড়াতে পারত না। এবার টিকাদানের কভারেজ কমে যাওয়ায় ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে এবং সব বয়সী মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, বুকের দুধ খাওয়া শিশুরা সাধারণত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে অন্তত ৯ মাস পর্যন্ত কিছুটা সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু এবার ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসে আগের তুলনায় কোনো মিউটেশন বা গঠনগত পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাস থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪৩৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৭০ শিশু এবং হামের উপসর্গে মারা গেছে আরও ৩৬৯ শিশু। একই সময়ে দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৩০৫ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৪ হাজার ৪১৯ জন।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে হাম উপসর্গে মারা গেছে ১৯২ শিশু এবং আক্রান্ত হয়েছে ২৯ হাজার ৪৮১ জন। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, অপুষ্টি মোকাবিলা এবং আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au