ভয়াবহ ঝড়ে টিনের চালাসহ আকাশে উড়ে গেলেন রিকশাচালক, উত্তর প্রদেশে প্রাণহানি ১১১
মেলবোর্ন, ১৫ মে- ভারতের উত্তর প্রদেশে ভয়াবহ ঝড়, বজ্রপাত ও ভারি বৃষ্টিতে অন্তত ১১১ জন নিহত হয়েছেন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই বেরেলি জেলায় ঘটেছে অবিশ্বাস্য…
মেলবোর্ন, ১৫ মে- বাংলাদেশে চলমান হাম প্রাদুর্ভাব শুধু একটি জনস্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দায় এড়ানোর প্রবণতারও এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু ঘটলেও জাতীয় রাজনীতি, সংসদীয় আলোচনা এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার জায়গায় এখনো দৃশ্যমান হয়নি প্রয়োজনীয় জরুরি প্রতিক্রিয়া।
সম্প্রতি নিজের আট মাস ১৮ দিনের শিশুকে হাম রোগে হারানো ফারজানা ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “গত দুই মাস ধরে নিষ্পাপ শিশুরা মারা যাচ্ছে, অথচ সংসদে এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। কেউ দায় নিচ্ছে না, কেউ ব্যর্থতা স্বীকার করছে না। সব দোষ চাপানো হচ্ছে মা আর শিশুদের ওপর। তাহলে তারা এ দেশে জন্ম নিল কেন?”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১২ মে পর্যন্ত নিশ্চিত ও উপসর্গভিত্তিক হাম আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছেছে ৪২৪ জনে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নতুন কোনো রোগ নয়, এটি টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। ফলে আবারও এত বড় আকারে রোগটির বিস্তার স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন আনা হয়, সেটিই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আগে আন্তর্জাতিক অংশীদার বিশেষ করে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত কাঠামোবদ্ধ টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থা পরিবর্তন করে উন্মুক্ত দরপত্রভিত্তিক পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করা হয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তখনই সতর্ক করেছিলেন, এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং টিকাদান কাভারেজ কমে যেতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় হাম ভাইরাস নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।
তবে সরকারি তথ্য আরও একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে। নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৬০ শিশুর প্রায় অর্ধেকের বয়স ছিল নয় মাসের কম। অর্থাৎ তারা নিয়মিত টিকা গ্রহণের বয়সেই পৌঁছায়নি। ফলে সংকটটিকে শুধুমাত্র টিকা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাসেরও কম সময় পার করেছে। প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও স্বাস্থ্য খাতের সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতার মধ্যে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সহজ নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু সমালোচকদের মতে, সরকার পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে জরুরি জাতীয় সংকট হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

হামে শিশু হত্যার দায়ে ইউনূসের বিচারের দাবিতে পেশাজীবিদের মানববন্ধন । ছবি : সংগৃহীত
সরকারের পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত মূলত প্রশাসনিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ, ক্যাচ-আপ টিকাদান কার্যক্রম এবং কিছু প্রশাসনিক সমন্বয় করা হলেও ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বিশেষ করে শিশুদের দ্রুত টিকাদানে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য বড় পরিসরে কোনো প্রচার অভিযান চালানো হয়নি।
একই সঙ্গে সরকার যেন দায় এড়ানোর কৌশলও অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাম পরিস্থিতিকে “অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট” হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জনমনে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেননি।
তবে সরকারের নিজের ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অসঙ্গতি সামনে এসেছে। গত ১০ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হঠাৎ করে সরকারি মৃত্যুর সংখ্যা ৩৫২ থেকে বাড়িয়ে ৪০৯ দেখায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর তথ্য আগের হিসাবেই অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা তথ্য ব্যবস্থাপনার সংকটের ইঙ্গিত দেয়। অথচ মহামারি মোকাবিলায় সঠিক তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। জাতীয় নাগরিক পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী সরকারকে সমালোচনা করলেও তা অনেকটাই সীমিত। কারণ, টিকা সংগ্রহ ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের যেসব সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তার কিছু অংশ অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে সেই সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেও জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে।

হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাইল সিপিবি । ছবিঃ সংগৃহীত
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলেননি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সৈয়দুর রহমান একটি লিখিত প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেছেন, ইউনিসেফ থেকে পাওয়া বার্তাটি “হাম প্রাদুর্ভাবের সতর্কবার্তা ছিল না।” তবে সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম এখনো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুরো পরিস্থিতিতে “সুবিধাজনক নীরবতার রাজনীতি” স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দায় স্বীকার করা হচ্ছে তখনই, যখন তা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। আর দায়ের ঝুঁকি থাকলে সেটিকে অন্যের ওপর ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টিকে রাজনৈতিক কটাক্ষের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেক পোস্টে শিশু মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ঘটনাকেও বর্তমান সরকারকে বিদ্রূপ করার উপকরণে পরিণত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের সম্ভাবনাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও এ ঘটনায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের বিচার দাবি করেছে। তবে দলটির সীমিত রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিষয়টি খুব বেশি আলোচনায় আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকের মধ্যে আশা তৈরি হয়েছিল যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে। জনস্বার্থ ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন ধরনের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর সেই প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছিল।
কিন্তু হাম প্রাদুর্ভাব সেই প্রত্যাশার প্রথম বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। আর এখন পর্যন্ত যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে রাজনৈতিক কাঠামো বদলালেও সংকট মোকাবিলার পুরোনো সংস্কৃতি খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি। শত শত শিশুর মৃত্যু হলেও এখনো তৈরি হয়নি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কিংবা সমন্বিত দায়বদ্ধতা।
বিশ্লেষকদের মতে, জনদুর্ভোগকে যদি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে তুলে জাতীয় জরুরি সংকট হিসেবে দেখা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকটে দেশকে একই চক্রের ভেতর ঘুরতে হবে।
সূত্রঃ ডেইলি স্টার
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au